বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও উন্নত ও সহজলভ্য করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ যেন কোনো ধরনের ভোগান্তি ছাড়াই কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা লাভ করতে পারে। গ্রামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য যাতে অন্যত্র যাওয়ার প্রয়োজন না হয় এবং সরকারি হাসপাতালগুলো যেন সাধারণ মানুষের আস্থার একমাত্র প্রতীক হয়ে ওঠে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনা প্রদান করেন। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক অগ্রগতি মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের উদ্দেশ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তার সরাসরি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের নজির এটিই প্রথম, যা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে বর্তমান প্রশাসনের সদিচ্ছা ও গুরুত্বকে নির্দেশ করে।
বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের বিগত পাঁচ মাসে স্বাস্থ্য খাতের অর্জন ও সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত, মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পূর্ববর্তী সময়ে স্বাস্থ্য খাত নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল, যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যথাযথ চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছিল। বর্তমান প্রশাসন সেই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্বাস্থ্য খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং সেবার মান বাড়াতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বৈঠকে তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও সেবার মান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি এবং রোগীদের অসন্তুষ্টির বিষয়টি উঠে আসে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন, চিকিৎসকদের রোগীদের প্রতি আরও অধিক আন্তরিক হতে হবে এবং দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন তিনি। গ্রামীণ জনপদের প্রতিটি মানুষের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায় এদিনের বৈঠকে। কিডনি রোগীদের ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগ লাঘবে দেশের প্রতিটি জেলা পর্যায়ে বিদ্যমান ডায়ালাইসিস সুবিধা সম্প্রসারণের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, জেলা পর্যায়ে যেসব স্থানে বর্তমানে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার চালু রয়েছে, সেগুলোকে উন্নীত করে পর্যায়ক্রমে ৫০ শয্যায় রূপান্তর করা হবে। পাশাপাশি, আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হয়। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল সৃষ্টি এবং পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট বা প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া, চিকিৎসাসেবার পরিধি বাড়াতে দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ৫১ শয্যা থেকে উন্নীত করে ১০১ শয্যায় রূপান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ১০১ শয্যার হাসপাতালগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জনবল নিয়োগের বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা নতুন অবকাঠামোর নকশা এবং নির্মাণকাজের বিভিন্ন কারিগরি দিক উপস্থাপন করেন। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের চিত্র পাল্টে যাবে এবং নগরকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর সাধারণ মানুষের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে।
বৈঠকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর প্রধান প্রধান বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক ও শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকরা উপস্থিত ছিলেন। স্বাস্থ্য খাতের এই সংস্কারমূলক উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের চিকিৎসাবঞ্চিত থাকার প্রবনতা দূর হবে এবং দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সাধিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।