আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে জর্ডানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর ড্রোন ও ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর দুইজন সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে, হামলায় নিখোঁজ থাকা অপর এক মার্কিন সেনার সন্ধানে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আহতদের জর্ডানের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয়েছে।
জর্ডানে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে এই হামলার পর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। হামলার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশনায় শনিবার রাতে ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে টানা অষ্টম দিনের মতো বিমান হামলা পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার জবাব দিতেই এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
চলমান এই সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে। বিগত এক মাস আগে কার্যকর হওয়া প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পর উভয় দেশের মধ্যে বৈরিতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রশাসন ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি তেল পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ ঘোষণা করায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এই হামলার পর এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বারবার চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে বলেন, মার্কিন প্রশাসনের কোনো প্রতিশ্রুতিই এখন আর গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিস্থিতি উসকে দেওয়ার অভিযোগ উত্থাপন করেন এবং ভবিষ্যতে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুঁশিয়ারি প্রদান করেন। অন্যদিকে, জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করা অন্তত ১০টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে, যা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন নাগরিকদের জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে, অন্যথায় ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় সামরিক হামলার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত তিন সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ৫০ জন ইরানি নাগরিক নিহত এবং ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। যুদ্ধের এই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ও পাল্টাপাল্টি সামরিক আক্রমণের ফলে পুরো মধ্যপ্রাচ্য বর্তমানে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ সফল না হলে এবং উত্তেজনা প্রশমিত না করা গেলে এই সংঘাত একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর। বর্তমানে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান কঠোর করায় যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।