অর্থনীতি প্রতিবেদক
দেশের পোশাক শিল্পের সংকট উত্তরণে ব্যাংক ঋণের সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার। বেসরকারি খাতকে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর। শুক্রবার রাজধানীর নিকুঞ্জে পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠন ‘বাগমা’ আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ কথা জানান।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রী দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত কয়েক বছরে ব্যাপক হারে অর্থ পাচারের ফলে জাতীয় অর্থনীতি বর্তমানে চরম সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। এই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করা এবং প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তবে বেসরকারি খাতের বিকাশের মাধ্যমে এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে তিনি মত দেন।
জুলাই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, এই আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তনের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ছাত্ররা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে এই পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হলো সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করা এবং কোনোভাবেই এই সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়, তা নিশ্চিত করা।
মন্ত্রী আরও বলেন, রাষ্ট্রকাঠামোকে গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই এখন প্রধান লক্ষ্য। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারলে অর্থনীতির চাকাও গতিশীল হবে। তিনি পোশাক শিল্পসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
পোশাক শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস। বিগত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারের কারণে এই শিল্প খাত নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে, ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এমতাবস্থায়, পোশাক মালিকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘ দিন ধরে ঋণের সুদহার কমানোর দাবি জানানো হচ্ছিল। মন্ত্রীর এ বক্তব্যের মাধ্যমে পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে ঋণের সুদহার কমানোর পাশাপাশি এলসি সুবিধা সহজীকরণ এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পোশাক খাত সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যাংক ঋণের সুদহার পুনর্নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
কর্মশালায় পোশাক খাতের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা পোশাক শিল্পের বর্তমান সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন এবং সরকারের কাছে নীতি সহায়তার দাবি জানান। মন্ত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং পর্যায়ক্রমে সব দাবি বিবেচনার আশ্বাস প্রদান করেন। অনুষ্ঠান শেষে দেশের পোশাক খাতের উন্নয়নে ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে একটি ঐক্যবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।