শীর্ষ সংবাদ ডেস্ক
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পায়ন ত্বরান্বিতকরণ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ ও সমন্বিত করার লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। নতুন এই আইনের আওতাধীন বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ বিলুপ্ত করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ নামে একটি একক ও শক্তিশালী নতুন সংস্থা গঠন করা হবে। এর ফলে দেশের বিনিয়োগ, শিল্পাঞ্চল ও পিপিপি প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম এখন থেকে একটিমাত্র সমন্বিত কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হবে।
গতকাল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিলটি উত্থাপনের পর বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান এর ওপর আপত্তি ও জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব জানান। তবে কণ্ঠভোটে সেই আপত্তি ও প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। বিলটির প্রয়োজনীয়তা ও এর বিভিন্ন দিক নিয়ে সংসদে বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিলটি পাসের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়। এর আগে, চলতি বছরের ৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এই বিলের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছিল।
পাস হওয়া আইন অনুযায়ী, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ দেশের প্রধান বিনিয়োগ উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ ও সমন্বয়কারী একক সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। নতুন এই কাঠামোর মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগের অনুমোদন, প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত কাগুজে প্রক্রিয়া, কর ও শুল্ক প্রণোদনা, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও সমন্বিত রূপ লাভ করবে। আইনে বিশেষভাবে সিঙ্গেল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স ও ওয়ানস্টপ সার্ভিস নিশ্চিতকরণ, অনুমোদন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) সম্প্রসারণ এবং দেশীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলোকে আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আইন পাসের ফলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আমূল পরিবর্তিত হবে। ইতিপূর্বে বিনিয়োগকারীদের বিডা, বেজা কিংবা পিপিপি কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যে দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হতো, তা একক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরসন সম্ভব হবে। নতুন আইনের উল্লেখযোগ্য বিধানের মধ্যে রয়েছে— দেশের সব অর্থনৈতিক অঞ্চল, মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল এবং ঘোষিত বিশেষ শিল্পাঞ্চলকে একটি সমন্বিত ও সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আনা। এ ছাড়া লাইসেন্স ও বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন প্রদানের সর্বোচ্চ সময়সীমা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পায়। ক্ষুদ্র আকারের পিপিপি প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক ধাপ কমিয়ে সহজ ও দ্রুত অনুমোদনের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে, রাষ্ট্রের অব্যবহৃত সরকারি জমি, স্থাপনা ও অন্যান্য অচল সম্পদকে উৎপাদনশীল ও শিল্পায়নের কাজে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে এই আইনের মাধ্যমে। বিনিয়োগ ও ব্যবসাসংক্রান্ত সব ধরনের নাগরিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সেবা একটি একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা অ্যাপ্লিকেশনের আওতায় আনার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।
বিলে দেশি-বিদেশি যৌথ অংশীদারিতে বৃহৎ বিনিয়োগ উদ্যোগের অনুমোদন, দেশীয় শিল্পে টেকসই পুঁজি গঠন, বিদেশি ঋণ ও বিনিয়োগ সহজলভ্য করার প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়োগের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নির্ধারণ, দ্রুত ভিসা সুপারিশ, কর্মানুমতি (ওয়ার্ক পারমিট) প্রদান, উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্থানীয় শিল্প খাতের উৎপাদনসক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও প্রয়োজনীয় ও যুগোপযোগী আইনি বিধান রাখা হয়েছে। এই আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার সূচক (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বাজারে দেশের প্রতিযোগিতাসক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।