আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বঙ্গোপসাগরের মিয়ানমার উপকূলে পৃথক দু’টি নৌকাডুবির ঘটনায় ৫৩০ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। জাতিসংঘের অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা (আইওএম) এবং শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) যৌথ এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। সাগরে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে যাওয়ার পথে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থা দু’টির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, গত জুন মাসের শেষ সপ্তাহে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চল থেকে ৫১০ জনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে নৌকা দু’টি যাত্রা শুরু করেছিল। এর মধ্যে একটি নৌকায় ২৫০ জন এবং অপরটিতে ২৬০ জন আরোহী ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অবরুদ্ধ থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার টেকনাফ শরণার্থী শিবির থেকে পালিয়ে আসা বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষও ছিলেন।
উদ্ধারকারী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, জুন মাসের শেষে যাত্রা শুরু করার পর প্রায় দুই সপ্তাহ সাগরে ভাসমান ছিল নৌকা দু’টি। পরবর্তীতে গত ৮ জুলাই মিয়ানমারের ইরাওয়াদি অঞ্চলের উপকূলে এসে নৌকা দু’টি বৈরী আবহাওয়ার মুখে পড়ে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রথমে ২৫০ জন আরোহী নিয়ে একটি নৌকা ডুবে যায় এবং এর কিছু সময় পর ২৬০ জন যাত্রীসহ দ্বিতীয় নৌকাটিও সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গে তলিয়ে যায়। দুর্ঘটনার পর এখন পর্যন্ত কোনো যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে আইওএম ও ইউএনএইচসিআর।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের বরাতে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, নৌকা দু’টির সুনির্দিষ্ট গন্তব্য নিশ্চিত হওয়া না গেলেও সমুদ্রের এই রুটটি সাধারণত মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডে মানব পাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, উন্নত জীবনের আশায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো একটি দেশে পৌঁছানোই ছিল এই যাত্রীদের মূল লক্ষ্য। সাধারণত বঙ্গোপসাগরে নৌযান চলাচলের জন্য নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পাঁচ মাস সময়কে নিরাপদ ধরা হয়। বাকি সাত মাস সমুদ্র অত্যন্ত উত্তাল ও দুর্যোগপূর্ণ থাকে। চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই সময়ে সাগর পাড়ি দিতে গিয়েই এই বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর দমনপীড়নের মুখে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আট লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। দীর্ঘমেয়াদী শরণার্থী জীবন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক বছরে সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ ব্যবহার করে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, যার মধ্যে নয় শতাধিক মানুষের সাগরে সলিল সমাধি ঘটেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানব পাচারকারীদের তৎপরতা বন্ধ এবং রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না হলে সমুদ্রপথে এই ধরনের প্রাণহানি প্রতিরোধ করা কঠিন হবে। একই সাথে আঞ্চলিক দেশগুলোকে মানব পাচার প্রতিরোধ ও সমুদ্র উদ্ধার অভিযানে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।