বরিশাল — জেলা প্রতিনিধি
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিগত ১৭ বছরের মতো আগামীতেও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, দলীয় মতপার্থক্য যেন কোনোভাবেই সাংগঠনিক ঐক্যকে বিনষ্ট না করে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যেকোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি।
সোমবার বিকেলে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত বিএনপির এক স্থানীয় সাংগঠনিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বিগত ১৭ বছরে দলের নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার প্রেক্ষাপট স্মরণ করেন। তিনি বলেন, বিগত দীর্ঘ সময় ধরে নানা গুম, খুন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এবং পারিবারিক ত্যাগ স্বীকার করে দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন। বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক নিপীড়নের ভয় না থাকলেও, এই সময়ে দলের অভ্যন্তরে বিভেদ সৃষ্টি হতে দেওয়া যাবে না। আগামীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জয়লাভ করতে হলে এখন থেকেই প্রতিটি স্তরে সুনির্দিষ্ট প্রস্তুতি ও সাংগঠনিক ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
বক্তব্যে দল পুনর্গঠন ও আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ‘হাইব্রিড’ ও ‘গুপ্ত’ চক্রের অনুপ্রবেশ সম্পর্কে নেতাকর্মীদের বিশেষভাবে সতর্ক করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি উল্লেখ করেন, নির্বাচন নস্যাৎ এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে দেশের ভেতরে ও বাইরে এখনো নানা ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্র রুখতে দলের মূল নেতৃত্বে যেন কোনো সুবিধাবাদী বা অনুপ্রবেশকারী প্রবেশ করতে না পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
দেশের চলমান উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বিগত ১৭ বছরের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক অনিয়মের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় ও পাচার করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয় এবং অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বাধীন শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করেন, যেখানে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের চিত্র উঠে এসেছে। তিনি বলেন, টেকসই পরিকল্পনা না থাকায় দৃশ্যমান বড় অবকাঠামো হলেও দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মহানগরের জলবদ্ধতা দূরীকরণের মতো মৌলিক খাতগুলো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরকারের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকৃত উন্নয়ন কেবল রাস্তাঘাট নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং শিশুদের চিকিৎসাসেবা সহজতর করতে দেশব্যাপী এক হাজার নতুন শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দেশের তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন তিনি।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত, নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং অকার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এরপরও সরকারের পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণসহ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ তিনি তুলে ধরেন। তিনি দেশের সামগ্রিক শৃঙ্খলা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় প্রশাসন ও দলীয় নেতাকর্মীদের কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব যাতে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হতে পারে, সেজন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে। কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যেন দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট বা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানোর সুযোগ না পায়, সে লক্ষ্যে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সতর্ক পাহারায় থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।