অর্থনীতি প্রতিবেদক
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা বজায় রাখা এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আগামী তিন অর্থবছরের মধ্যে দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০.৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সরকারের ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি ২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯’ শীর্ষক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় রাজস্ব আহরণের এই ইতিবাচক প্রক্ষেপণ ও আশাবাদের কথা জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের পর্যালোচনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি বর্তমানে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ও জরুরি পূর্বশর্ত। এই লক্ষ্য অর্জনে আগামী কয়েক বছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট রাজস্ব জিডিপির ৮.৩ শতাংশ থাকলেও সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে। সমপর্যায়ের অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির তুলনায় বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও বেশ নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে রাজস্বের এই সাময়িক হ্রাসের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কর আহরণ প্রক্রিয়ার কাঠামোগত দুর্বলতা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর অব্যাহতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আমদানি-সংশ্লিষ্ট রাজস্ব প্রাপ্তি কমে যাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে মধ্যমেয়াদে এই পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে উন্নতির আশা প্রকাশ করেছে সরকারি থিংক ট্যাংক।
প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, সামগ্রিক রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১০.২ শতাংশ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ১০.৫ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১০.৭ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একই সঙ্গে এনবিআর-এর নিজস্ব কর রাজস্ব আহরণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জিডিপির ৬.৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৮.৮ শতাংশ, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৯.১ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৯.৩ শতাংশে পৌঁছাবে বলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে এনবিআর-বহির্ভূত কর রাজস্ব জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৩ থেকে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে সীমিত থাকবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় কর কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মধ্যমেয়াদে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে এবং দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। একটি ন্যায্য, প্রযুক্তিনির্ভর, সর্বজনীন ও পূর্বানুমানযোগ্য রাজস্ব কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগ এবং কর আদায়ের চক্রকে আরও গতিশীল করতে সরকার বদ্ধপরিকর। এজন্য কর ব্যবস্থার পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন এবং করদাতাদের আস্থা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ রাজস্ব প্রশাসন গড়ে তোলার কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি নীতি বিবৃতি প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, দেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মূল্যের স্থিতিশীলতা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সহনশীলতা বজায় রাখতে উপযুক্ত মাত্রার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি লক্ষ্যভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা সংক্রান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এই মুহূর্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। উল্লেখ্য, অর্থ বিভাগের এই মধ্যমেয়াদি বিশ্লেষণে সামগ্রিক রাজস্ব খাতের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে মোট রাজস্বের হিসাবের মধ্যে আন্তর্জাতিক অনুদানকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।