বিশেষ প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে দীর্ঘ সাড়ে চার মাস পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবরুদ্ধ থাকার পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী সফলভাবে অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’। আজ মঙ্গলবার ভোর ৩টার দিকে জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরের জলসীমার উদ্দেশ্যে রওনা করে। ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এই জলপথ অতিক্রমের মাধ্যমে জাহাজটি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা থেকে মুক্ত হলো। এই ঘটনার পর জাহাজটিতে কর্মরত বাংলাদেশি নাবিকদের পরিবার ও দেশের মেরিটাইম খাতে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
বিএসসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে নির্মিত ৩৮ হাজার ৮৯৪ ডিডব্লিউটি ধারণক্ষমতার এই বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজটি বর্তমানে নিরাপদ বাংকারিং ও প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ফুজাইরা বন্দরের জলসীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। জাহাজটিতে কর্মরত ৩১ জন ক্রুর সবাই বাংলাদেশি নাগরিক এবং বর্তমানে তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুস্থ আছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি চার্টারের অধীনে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি গত ২৬ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করেছিল। প্রাথমিক সূচি অনুযায়ী জাহাজটি কাতারের মেসাইদ বন্দর থেকে ৩৯ হাজার টন স্টিল কয়েল বোঝাই করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে নিয়ে আসে। তবে জাহাজটি জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ওই অঞ্চলে তীব্র আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধাবস্থার কারণে জাহাজের কার্গো খালাস প্রক্রিয়া চরম হুমকির মুখে পড়লেও, গত ১১ মার্চ জেবেল আলী বন্দরে স্টিল কয়েল কার্গো খালাস সম্পন্ন করা হয়।
কার্গো খালাস হওয়ার পর যুদ্ধ পরিস্থিতির তীব্রতায় জাহাজটির পক্ষে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বাণিজ্যিক ক্ষতি এড়াতে এবং চার্টারারের দৈনিক ভাড়া বা ‘হায়ার’ প্রাপ্তি বজায় রাখতে বিএসসি কর্তৃপক্ষ বিকল্প বাণিজ্যিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, জাহাজটিকে সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দরে পাঠানো হয় এবং সেখান থেকে প্রায় ৩৭ হাজার মেট্রিক টন সার বোঝাই করে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন ও ডারবান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা করানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনার কারণে জাহাজটি একদিনের জন্যও ‘অফ-হায়ার’ বা ভাড়াহীন অবস্থায় ছিল না।
তবে সার বোঝাই করার পর হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি আর পারস্য উপসাগর থেকে বের হতে পারেনি। দীর্ঘ অচলাবস্থার একপর্যায়ে, গত ১৮ এপ্রিল ইরান নৌবাহিনী নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণ দেখিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজটির পারাপারের অনুমতি প্রত্যাখ্যান করে। ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে আটকা পড়ে বিএসসির এই বাণিজ্যিক জাহাজটি।
দীর্ঘদিন অবরুদ্ধ থাকার এই সংকটকালীন পুরো সময়জুড়ে জাহাজের ৩১ বাংলাদেশি নাবিক ও ক্রুদের মনোবল বজায় রাখতে বিএসসি নিয়মিত তদারকি করেছে। জাহাজে সুপেয় পানি, খাবার, রসদ ও জ্বালানি তেলের মতো প্রয়োজনীয় লজিস্টিকস সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি নাবিকদের আর্থিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ অনুমোদন সাপেক্ষে দৈনিক ৫ মার্কিন ডলার বিশেষ মিল অ্যালাউন্স, ঈদের বিশেষ প্রণোদনা এবং ঝুঁকি ভাতা বা ‘ওয়ার ওয়েজ’ প্রদান করা হয়।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিএসসি ম্যানেজমেন্টের যৌথ অ্যাকশন প্ল্যান ও কূটনৈতিক তদারকি এই ঝুঁকিপূর্ণ মিশন সফলভাবে সম্পন্ন করার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সার্বক্ষণিক নজরদারি ও দিকনির্দেশনায় উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, জাতীয় এই সংকটে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সার্বক্ষণিক নিবিড় নজরদারি রাখা হয়েছিল।
একই সঙ্গে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া ভিডিও কনফারেন্স ও ফোনালাপের মাধ্যমে জাহাজের ক্যাপ্টেন ও নাবিকদের নিয়মিত খোঁজ নিয়েছেন এবং তাদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। উচ্চপর্যায়ের সুনির্দিষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান, বিএসসি কর্তৃপক্ষের ক্রাইসিস হ্যান্ডলিং এবং জাহাজের ক্যাপ্টেন ও চিফ ইঞ্জিনিয়ারসহ সব ক্রুদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক এই মেরিটাইম সংকট সফলভাবে নিরসন করা সম্ভব হয়েছে।