আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা ইরানের ১ হাজার ২০০ কোটি (১২ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের রাষ্ট্রীয় সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে দীর্ঘ ১৮ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠকের পর এই কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জিত হয়।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সফল হয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরান অবরুদ্ধ অর্থ অবমুক্ত করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। এই সমঝোতার আওতায় আটকে থাকা অর্থ দুটি পৃথক কিস্তিতে (প্রতিটি ৬ বিলিয়ন ডলার) অবমুক্ত করা হবে।
সমঝোতার অংশ হিসেবে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাও কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, আগামী ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পেট্রোরাসায়নিক পণ্য এবং এ সংক্রান্ত উপজাত সামগ্রী বিক্রির বিশেষ অনুমতি বা ছাড় পাবে। এর পাশাপাশি ব্যাংকিং, বিমা এবং পরিবহন খাতের ওপর থেকেও সাময়িকভাবে বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করা হয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শকদের ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে পুনরায় কাজ করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে তেহরান সম্মত হওয়ায় ওয়াশিংটন এই অর্থনৈতিক ছাড় দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ মধ্যস্থতায় এই আলোচনা ও সমঝোতা সম্পন্ন হয়। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় উভয় পক্ষ এই দ্বিপাক্ষিক সমঝো স্মারকে (এমওইউ) পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই সমঝোতার পরপরই অবমুক্ত হওয়া অর্থের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও দ্বিমত তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, অবমুক্ত করা এই অর্থের একটি বড় অংশ ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে উৎপাদিত কৃষিপণ্য ক্রয়ের জন্য ব্যয় করতে হবে। তবে ওয়াশিংটনের এই দাবিকে তাৎক্ষণিকভাবে এবং সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, অবমুক্ত হওয়া অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কোন খাতে ব্যয় করা হবে, সে সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিজস্ব এখতিয়ার। যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য আমদানির জন্য ইরানকে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ বা বাধ্য করা যাবে না। তেহরান তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রয়োজন, জাতীয় স্বার্থ ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করে এই অর্থ ব্যবহারের স্বাধীন পরিকল্পনা নির্ধারণ করবে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা দীর্ঘদিনের বৈরী দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে একটি বড় অগ্রগতি। বিশেষ করে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ উন্মুক্ত রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য সচল করার ক্ষেত্রে এই চুক্তির প্রভাব ইতিবাচক হতে পারে। তবে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মেয়াদ, পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এবং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এখনো গভীর নীতিগত জটিলতা ও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।