নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীতে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত তাজিয়া মিছিলের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং যান চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সুনির্দিষ্ট কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। আগামী শুক্রবার (২৬ জুন) ১০ মহররম দেশব্যাপী পবিত্র আশুরা উদযাপিত হবে। এই ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ প্রশাসন এই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) ডিএমপি সদরদপ্তর থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এই নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। ডিএমপি কমিশনার কর্তৃক স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১০ মহররম ১৪৪৮ হিজরী (২৬ জুন ২০২৬ খ্রি.) পবিত্র আশুরা উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী তাজিয়া মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এসব মিছিলে শৃঙ্খলার স্বার্থে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
ডিএমপির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, তাজিয়া মিছিলে কিছু ব্যক্তি দা, ছোরা, কাঁচি, বর্শা, বল্লম, তরবারি ও লাঠির মতো ধারালো এবং বিপজ্জনক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। অনেক সময় এসব অস্ত্রের প্রদর্শন ও ব্যবহার ক্ষেত্রবিশেষে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যা সাধারণ নগরবাসীর মনে আতঙ্ক ও ভীতি সঞ্চার করে। একই সাথে এটি জননিরাপত্তার জন্যও এক ধরনের হুমকি স্বরূপ। তাই জনস্বার্থে এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্সের (অর্ডিন্যান্স নং- III/৭৬) ২৮ ও ২৯ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে তাজিয়া মিছিলে সব ধরনের অস্ত্র বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মহররম মাসে পবিত্র আশুরাকে কেন্দ্র করে ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে আতশবাজি ও পটকা ফোটানোর প্রবণতা দেখা যায়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড পবিত্র আশুরার মূল ধর্মীয় শোক ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পটকা ও আতশবাজির বিকট শব্দে সর্বসাধারণের স্বাভাবিক চলাচল বিঘ্নিত হয় এবং শহরের শান্তিশৃঙ্খলা ব্যাহত হয়। এই কারণে তাজিয়া মিছিলের রুট ও এর আশেপাশের এলাকায় সব ধরনের আতশবাজি ফোটানো ও পটকা বিক্রি বা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ডিএমপি জানিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা তাজিয়া মিছিলের প্রারম্ভিক সময় থেকে শুরু করে মিছিলের সমাপ্তি পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য বলবৎ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও পুলিশের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা মহানগরীতে পবিত্র আশুরার তাজিয়া মিছিলকে কেন্দ্র করে অতীতে বিভিন্ন সময়ে নাশকতা ও অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালে পুরান ঢাকার হোসনি দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতি চলাকালে বোমা হামলার ঘটনার পর থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ প্রতি বছরই আশুরার নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে থাকে। বর্তমান আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় এই আগাম নিষেধাজ্ঞা নগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও পুরান ঢাকার হোসনি দালান ইমামবাড়া, বড় কাটরা, ছোট কাটরা এবং মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর যেসব এলাকা থেকে তাজিয়া মিছিল বের হয়, সেসব রুটকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মিছিলের পুরো রুট সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকবে এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ নিয়োজিত থাকবে। কোনো ধরনের উসকানি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া ইমামবাড়াগুলোর প্রবেশদ্বারে আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি চালিয়ে দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থীদের প্রবেশ করানো হবে।
পবিত্র আশুরার মূল তাৎপর্য ও শোকের আবহ বজায় রেখে শান্তিপূর্ণভাবে এই ধর্মীয় আচার সম্পন্ন করার জন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে আয়োজক কমিটি, শিয়া সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ নগরবাসীর প্রতি পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। একই সাথে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে তাজিয়া মিছিল চলাকালীন নির্দিষ্ট সড়কগুলো পরিহার করে বিকল্প সড়কে যানবাহন চলাচলের জন্য নগরবাসীকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।