ক্রীড়া প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক ফুটবলে উরুগুয়ে দলের সোনালী অধ্যায় এবং লুইস সুয়ারেজের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। গত দুই দশকে বিশ্বমঞ্চে দলটির গৌরবোজ্জ্বল উপস্থিতির পেছনে সুয়ারেজ ও দিয়েগো ফরলানের মতো ফুটবলারদের অবদান অনস্বীকার্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের পারফরম্যান্সে সেই জৌলুশ হারাচ্ছে দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সর্বশেষ ম্যাচে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দের বিপক্ষে উরুগুয়ের ড্র করার ঘটনাটি দলে লুইস সুয়ারেজের অনুপস্থিতি এবং গভীর এক শূন্যতার চিত্রকে নতুন করে সামনে এনেছে।
রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের মিয়ামিতে অনুষ্ঠিত ম্যাচে কেপ ভার্দের মুখোমুখি হয়েছিল উরুগুয়ে। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র হয়। এই ফলাফলের পর উরুগুয়ে জাতীয় দল এবং তাদের সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজকে ঘিরে একটি ঐতিহাসিক ও উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান সামনে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের পর থেকে বড় কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মূল মঞ্চে লুইস সুয়ারেজকে ছাড়া লা সেলেস্তেরা মাত্র একটি ম্যাচে জয়ের দেখা পেয়েছে। কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে এই ড্রয়ের ফলে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ মিশনকে সামনে রেখে উরুগুয়ের জয়হীন থাকার ধারা আরও দীর্ঘায়িত হলো। এই ম্যাচের আগে কোচ মার্সেলো বিয়েলসার শিষ্যরা তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে সৌদি আরবের সাথে ১-১ গোলে ড্র করেছিল। ফলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে দলটির ওপর চূড়ান্ত পর্বে পৌঁছানোর মনস্তাত্ত্বিক চাপ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের পর থেকে সুয়ারেজবিহীন উরুগুয়ের একমাত্র আন্তর্জাতিক সাফল্যটি এসেছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। সেবার দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে পরাজিত করেছিল লা সেলেস্তেরা। এরপর উরুগুয়ের অন্য সব আন্তর্জাতিক জয়ে স্ট্রাইকার হিসেবে মাঠে সুয়ারেজের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। মাঝের সময়ে ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে ব্যর্থ হয় উরুগুয়ে। ২০০২ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কোনো ম্যাচ না জিতেই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল দলটিকে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপেও খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি তারা। তবে ২০১০ সাল থেকে টানা বিশ্বমঞ্চে খেলছে উরুগুয়ে, যেখানে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রতিটি আসরেই দলের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন সুয়ারেজ।
উরুগুয়ে জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা লুইস সুয়ারেজ ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২—এই চারটি বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। প্রতিটি আসরেই তিনি দলের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ২০২৬ সালের বর্তমান বিশ্বকাপ পর্বেও দলের হয়ে মাঠে নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন ৩৯ বছর বয়সী এই তারকা, তবে বর্তমান কোচিং প্যানেলের পরিকল্পনায় জায়গা পাননি তিনি। ফলে ৯ নম্বর জার্সিধারী এই কিংবদন্তি ফুটবলারকে গ্যালারিতে বসেই কেপ ভার্দের বিপক্ষে দলের পয়েন্ট হারানোর ম্যাচটি দেখতে হয়েছে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচের শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল উরুগুয়ে। পরে ম্যাক্সি আরাউহো এবং ফাকুন্দো কানোবিওর গোলে ম্যাচে দারুণভাবে ফিরে আসে লা সেলেস্তেরা। তবে রক্ষণভাগের ধারাবাহিক ভুলের কারণে দ্বিতীয়ার্ধে হেলিও ভারেলার একটি সমতাসূচক গোল হজম করতে হয় উরুগুয়েকে। এই ড্রয়ের ফলে প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ পর্বে এসেও উরুগুয়ে দল জয়হীন অবস্থায় রয়েছে। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে, উরুগুয়ে দল লুইস সুয়ারেজের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও নেতৃত্বের ওপর কতটা নির্ভরশীল ছিল। আক্রমণভাগের ধার কমে যাওয়া এবং জয় নিশ্চিত করার মতো ফিনিশারের অভাব দূর করতে না পারলে আগামী ম্যাচগুলোতে উরুগুয়ের জন্য টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠবে।