আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউরোপজুড়ে চলমান রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা ও টানা তীব্র তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে দুই দিনে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত রবিবার ও সোমবার দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে দুই শিশুও রয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট বিশেষ আবহাওয়াগত পরিস্থিতির কারণে সমগ্র ইউরোপ জুড়েই বর্তমানে চরম আবহাওয়া বিরাজ করছে।
ফ্রান্সের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম জনবহুল বন্দরনগরী বোর্দোতে গত রবিবার ও সোমবার তাপমাত্রা ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা এই শহরটির আবহাওয়ার ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তীব্র এই গরমে বোর্দোতে তিন প্রবীণ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বয়স ৮০ থেকে ৯৫ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে, দেশটির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কার্পেন্ত্রাস জেলায় একটি ব্যক্তিগত গাড়ির ভেতরে আটকা পড়ে দুই ও চার বছর বয়সী দুটি শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
বাকি ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, তীব্র দাবদাহ থেকে সাময়িক স্বস্তি পেতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নদী, হ্রদ, সমুদ্রসহ বিভিন্ন উন্মুক্ত জলাশয়ে দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছেন। অসচেতনভাবে সাঁতার কাটতে গিয়েই এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। ফ্রান্সের বেসামরিক নিরাপত্তা সেবা বিভাগের মুখপাত্র জেরোম বওল্যাঙ্গার জানিয়েছেন, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে নাগরিকদের বারবার সতর্ক করা হচ্ছে এবং শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে থাকা নিরাপদ জলাশয়েই সাঁতার কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অস্বাভাবিক গরমের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশটির স্কুল ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের সময়সূচিতেও জরুরি পরিবর্তন এনেছে কর্তৃপক্ষ।
চলতি জুন মাসে কেবল ফ্রান্সই নয়, বরং স্পেনের উত্তরাঞ্চল থেকে শুরু করে যুক্তরাজ্য পর্যন্ত প্রায় পুরো ইউরোপই তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছে। স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় স্যান সেবাস্তিয়ান অঞ্চলটি ঐতিহ্যগতভাবে শীতল এলাকা হিসেবে পরিচিত, যেখানে জুন মাসেও সাধারণত তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে। তবে এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। স্পেনের আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুন স্যান সেবাস্তিয়ানের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এক নজিরবিহীন অভিজ্ঞতা।
একইভাবে রেকর্ড গরমে ভুগছে যুক্তরাজ্যও। দেশটিতে জুন মাসে এর আগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল ১৯৫৭ ও ১৯৭৬ সালে, যখন পারদ উঠেছিল ৩৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অথচ চলতি জুনের গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করেছে, যা পূর্বের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের চরম আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষকরা জানিয়েছেন, ইউরোপজুড়ে চলমান এই অস্বাভাবিক তাপপ্রবাহের পেছনে ‘ওমেগা ব্লক’ নামে পরিচিত একটি বিশেষ আবহাওয়াগত পরিস্থিতি কাজ করছে। এই প্রক্রিয়ায় বায়ুমণ্ডলের একটি বিস্তীর্ণ এলাকার মাঝখানে উষ্ণ বায়ুর স্ফীতি তৈরি হয় এবং এর দুই পাশে অবস্থান করে অপেক্ষাকৃত শীতল বায়ু। বর্তমানে সক্রিয় থাকা ‘ওমেগা ব্লক’টি উত্তর আফ্রিকা ও সাহারা অঞ্চল থেকে তীব্র উষ্ণ বায়ু টেনে আনছে, যার ফলে ইউরোপজুড়ে এই তীব্র তাপপ্রবাহ অনুভূত হচ্ছে। এই বায়ুপ্রবাহ অত্যন্ত ধীরগতিতে অগ্রসর হওয়ার কারণে ইউরোপের আকাশ থেকে মেঘ সরে গেছে এবং স্বস্তিদায়ক বাতাস চলাচল প্রায় বন্ধ রয়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ ও আকস্মিক ঝড়ের তীব্রতা এবং স্থায়িত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এর ফলে একদিকে যেমন সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন নতুন রেকর্ড তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে অতিবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানীরা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের একটি স্পষ্ট ও মারাত্মক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন, যা অদূর ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।