ক্রীড়া প্রতিবেদক
অভিষেক বিশ্বকাপেই ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় রচনা করেছে কুরাসাও। শক্তিশালী ইকুয়েডরের মুখোমুখি হয়ে গোলশূন্য ড্রয়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক এই মঞ্চে নিজেদের প্রথম পয়েন্ট অর্জন করেছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের দেশটি। এই ঐতিহাসিক অর্জনের মূল কারিগর ৩৭ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক এলয় রোম। পুরো ম্যাচজুড়ে দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ ইকুয়েডরের একের পর এক আক্রমণ একাই নসাৎ করে দিয়ে গোলবারের নিচে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর গড়ে তোলেন তিনি। তার এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই ইকুয়েডরকে হতাশ করে মাঠ ছাড়তে বাধ্য করে কুরাসাও।
ম্যাচটিতে মাঠের লড়াইয়ে পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করেছিল ইকুয়েডর। পুরো ৯০ মিনিটে তারা কুরাসাওয়ের গোলবার লক্ষ্য করে মোট ২৮টি শট নেয়। তবে কৌশলগত আক্রমণ ও একের পর এক জোরালো শট সত্ত্বেও তারা কুরাসাওয়ের জাল স্পর্শ করতে পারেনি। গোলরক্ষক এলয় রোম একক নৈপুণ্যে মোট ১৫টি নিশ্চিত গোল হওয়া থেকে দলকে রক্ষা করেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে কোনো গোলরক্ষকের এমন একক প্রতিরোধ গড়ে তোলার নজির বিরল। এই ড্রয়ের ফলে টুর্নামেন্টে নিজেদের টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট সংগ্রহ করল কুরাসাও।
এলয় রোমের এই ১৫টি সেভের কীর্তি বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ডের জন্ম দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালের পর থেকে বিশ্বকাপে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের ম্যাচে আর কোনো গোলরক্ষক এত বেশি সংখ্যক সেভ করতে পারেননি। এর আগে ১৯৭৮ সালের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পেরুর গোলরক্ষক র্যামন কুইরোগা এক ম্যাচে ১৩টি সেভ করে দীর্ঘ সময় এই রেকর্ডের অধিকারী ছিলেন। রোম দীর্ঘ ৪টি দশক পর কুইরোগার সেই পুরোনো রেকর্ড ভেঙে নিজের নাম ইতিহাসের পাতায় লিখিয়ে নিলেন।
তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নকআউট পর্বসহ সামগ্রিক বিবেচনায় এক ম্যাচে সর্বাধিক সেভের বিশ্বরেকর্ডটি এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক গোলরক্ষক টিম হাওয়ার্ডের দখলে রয়েছে। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়ার লড়াইয়ে অতিরিক্ত সময়সহ ১২০ মিনিটের ম্যাচে ১৬টি সেভ করেছিলেন হাওয়ার্ড। এলয় রোম সামগ্রিক সেই রেকর্ড স্পর্শ করতে না পারলেও, অতিরিক্ত সময় ছাড়া কেবল নির্ধারিত ৯০ মিনিটের মধ্যে ১৫টি সেভ করায় তার এই অর্জনকে ফুটবল বিশেষজ্ঞরা আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশেষ হিসেবে দেখছেন।
ম্যাচের কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, কুরাসাওয়ের আক্রমণভাগ প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে খুব বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। ইকুয়েডরের গোলরক্ষক হারনান গালিনদেজকে পুরো ম্যাচে মাত্র ৩টি সেভ করতে হয়েছে। কিন্তু কুরাসাওয়ের রক্ষণভাগের দুর্বলতা ঢেকে দিয়ে পুরো দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন রোম। ইকুয়েডরের ফরোয়ার্ডদের একের পর এক আক্রমণ যখন কুরাসাওয়ের রক্ষণব্যূহ ভেঙে ফেলছিল, তখন প্রতিবারই শেষ প্রহরী হিসেবে ত্রাণকর্তা হয়ে দাঁড়ান এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে প্রথমবার অংশ নিয়েই শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ দল ইকুয়েডরের বিপক্ষে এই ড্র কুরাসাওয়ের ফুটবল ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। ম্যাচ শেষে দেশটির ফুটবল সমর্থক ও খেলোয়াড়দের উদযাপনেই তার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। এই ঐতিহাসিক অর্জনের পর এলয় রোম এখন কুরাসাও ফুটবল ভক্তদের কাছে জাতীয় বীরের মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন। এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপ পর্বের পরবর্তী ম্যাচগুলোতে দলটির আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং টুর্নামেন্টের সমীকরণেও বড় প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।