অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার দেশব্যাপী ব্যাপক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর অংশ হিসেবে সারা দেশের ৫০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা হাসপাতালগুলোকে পর্যায়ক্রমে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে নির্ধারিত ১০টি হাসপাতালের তালিকায় স্থান পেয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার পরিধি যেমন বাড়বে, তেমনই হ্রাস পাবে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ।
গত শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় বাঞ্ছারামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্বিক চিকিৎসা কার্যক্রম ও অবকাঠামো পরিদর্শনকালে সরকারের এই উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। পরিদর্শন শেষে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল হাসপাতালের সেবার মানোন্নয়ন ও অবকাঠামোগত প্রসারের বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনসাধারণের দীর্ঘদিনের দাবি বিবেচনা করে এই হাসপাতালে জরুরি প্রসূতিসেবা বিশেষ করে সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের সুবিধা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালটিতে দক্ষ জনবলের অভাব থাকায় স্থানীয় রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যোগদান করায় জনবল সংকটের প্রাথমিক সমাধান হয়েছে। নতুন যোগদানকৃত চিকিৎসকদের মধ্যে একজন অ্যানেসথেসিয়া এবং অন্যজন গাইনি ও অবসটেট্রিক্স বিষয়ের বিশেষজ্ঞ। এই দুই কর্মকর্তার যোগদানের ফলে এখন থেকে সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় ও নামমাত্র খরচে দরিদ্র গর্ভবতী নারীরা সিজারিয়ান সেবার সুযোগ পাবেন। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে আর উন্নত চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে রাজধানী ঢাকা কিংবা জেলা সদরে যেতে হবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্বাস্থ্যসেবার মান আরও বাড়াতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালটিতে অতিরিক্ত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার যে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার রয়েছে, এই উদ্যোগ তারই ধারাবাহিকতা। চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাঞ্ছারামপুর ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে, মেঘনা নদীর ওপর প্রস্তাবিত সেতু নির্মিত হলে ঢাকার সঙ্গে বাঞ্ছারামপুরের সরাসরি ও দ্রুত যোগাযোগ স্থাপিত হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তনের ফলে স্থানীয় অঞ্চলে নতুন নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হবে। বিশেষ করে অত্র এলাকার যেসব অনাবাদি জমি রয়েছে, সেগুলোকে শিল্পায়নের আওতায় এনে বিভিন্ন কলকারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইতিমধ্যে বাঞ্ছারামপুর থেকে নবীনগর পর্যন্ত সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, যা আঞ্চলিক যোগাযোগকে আরও সহজতর করবে।
যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি বাঞ্ছারামপুর পৌরসভার আধুনিকায়নেও বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ রক্ষা ও শহরবাসীর বিনোদনের জন্য পৌরসভার ঢোলভাঙ্গা নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নদীর তীর ঘেঁষে আধুনিক ওয়াকওয়ে বা হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হবে। এই প্রকল্প পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি স্থানীয় নাগরিকদের জন্য একটি সুস্থ বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
হাসপাতাল পরিদর্শনকালে স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, হাসপাতালের চিকিৎসকবৃন্দ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ সরকারের এই জনকল্যাণমুখী উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের তাগিদ দেন। হাসপাতালটির আধুনিকীকরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন হলে তা সামগ্রিকভাবে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য খাতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।