আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের অবস্থান থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সরে আসার সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই নীতি পরিবর্তনের ফলে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক পরিকল্পনা ও কৌশলগত লক্ষ্য বড় ধরনের ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে। একই সঙ্গে এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের চেনা ক্ষমতার ভারসাম্যকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করছে।
বিগত কয়েক দশকে আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন কিংবা লিবিয়ায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের যে ধরন দেখা গেছে, ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। সেখানে শাসনভার পরিবর্তনের বাহ্যিক চেষ্টা সফল হয়নি, বরং তেহরান এই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ চুক্তির মাধ্যমে যে আঞ্চলিক কৌশলগত ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করা হয়েছিল, সৌদি আরব তাতে সই করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর ইরানের বিরুদ্ধে এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের এই অবস্থান পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের এই নীতি পরিবর্তন বা ইউ-টার্ন মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম এবং রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার হিসাব-নিকাশ ওয়াশিংটনকে এই সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে। এছাড়া আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকি এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থবিরতা মার্কিন স্বার্থে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল। ফলে, দীর্ঘমেয়াদি ও ঝুঁকিপূর্ণ সংঘাতের পথ পরিহার করে মার্কিন প্রশাসন এই অবস্থান গ্রহণ করেছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এই ঘটনাটিকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই সংকটের আগে মার্কিন সমর্থনে ইসরায়েলকে অঞ্চলের প্রধান সামরিক শক্তি মনে করা হলেও বর্তমান বাস্তবতায় ইরান একটি প্রভাবশালী পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সরকারের সমালোচকরা এটিকে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা ও কৌশলগত ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী দলগুলো এখন নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাধীনভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার দাবি তুলছে।
হোয়াইট হাউজের এই সিদ্ধান্তের পর ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যকার সম্পর্কেও এক ধরনের টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলের কট্টরপন্থী শিবিরের একাংশ মার্কিন এই অবস্থানকে নিজেদের স্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে দেখছে। তারা ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা নস্যাৎ করতে নিজস্ব উপায়ে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, বরং ওয়াশিংটনের রাজনীতিতেও ইসরায়েলের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন সাধারণ জনগণের মতামত এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় এক ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলকে একটি নির্ভরযোগ্য সামরিক মিত্রের পাশাপাশি এক প্রকার রাজনৈতিক দায় হিসেবেও বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসে ইসরায়েলি লবির একচ্ছত্র প্রভাব নিয়েও উভয় দলের ভেতরে সমালোচনা ও স্ক্রুটিনি বাড়ছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে লবিস্টরা মার্কিন আইনি কাঠামোয় নতুন কিছু ধারা যুক্ত করার চেষ্টা করছে।
এই পুরো সংকট থেকে ইরান কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পেরেছে। দেশটি তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র বহর অক্ষুণ্ন রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা যেকোনো বহিরাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে বড় ধরনের প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করছে। একই সাথে আঞ্চলিক অন্যান্য শক্তির সাথে তেহরানের কৌশলগত সমন্বয় আগের চেয়ে আরও সুদৃঢ় হয়েছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, আঞ্চলিক সংকটে ইরান নিজের মিত্রদের সুরক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
সামগ্রিক এই পরিস্থিতি এখন অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এবং ফিলিস্তিন সংকটের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক রাজনীতিতে চাপের মুখে থাকা ইসরায়েলি নেতৃত্ব নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সামরিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে পারে। তবে গাজার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ এবং বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের ওপর তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ একা সামাল দেওয়া তেল আবিবের জন্য কঠিন হবে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির চেনা সীমানা এখন এক নতুন রূপ ধারণ করেছে।