আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণ এবং এর বাণিজ্যিক ব্যবহারকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে এক গভীর বৈশ্বিক সংকট ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে তৈরি পরাক্রমশালী এআই মডেলগুলোর ওপর সম্প্রতি বিভিন্ন দেশের সরকার ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং এর ফলে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এআই পরিকাঠামো বা ডেটা সেন্টার স্থাপনের নামে পরিবেশগত বিপর্যয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার হরণের ঘটনা প্রযুক্তি খাতের এই দ্রুত বিকাশের পেছনে এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে।
অতি সম্প্রতি মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর তৈরি করা সর্বশেষ ও সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ‘ক্লড ফেবল’ এবং ‘ক্লড মিথোস’ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। নতুন এই নীতিমালার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বা বাইরে অবস্থানরত কোনো বিদেশি নাগরিক এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন না। মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে পারমাণবিক প্রযুক্তি বা স্যাটেলাইট সিস্টেমের মতোই একটি সংবেদনশীল ও জাতীয় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই খাতের এই কৌশলগত পরিবর্তন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের মেরুকরণ তৈরি করছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসনের সাথে শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্ব এবং যৌথ কৌশলগত আলোচনার কারণে চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো এখন এই এআই প্রযুক্তিকে মার্কিন সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতারই একটি বর্ধিত রূপ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। এর ফলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের আবহ তৈরি হয়েছে।
তবে এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে গভীর নীতিগত বৈপরীত্য রয়েছে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা। বিভিন্ন তথ্য ও ডেটা শিট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর পঞ্চম প্রজন্মের এই আধুনিক মডেলগুলো মূলত ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত কোটি কোটি সাধারণ মানুষের তৈরি তথ্য, উন্মুক্ত ফোরাম, উইকিপিডিয়া ও গবেষণাপত্রের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। মানবজাতির যৌথ জ্ঞান ভাণ্ডারকে ব্যবহার করে এই প্রযুক্তি তৈরি করার পর, এখন তা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলা হচ্ছে।
মুক্ত ও বিকেন্দ্রীকৃত জ্ঞানকে এভাবে বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তর করার এই প্রবণতাকে বিশেষজ্ঞরা একটি ‘নব্য-সামন্ততান্ত্রিক সমাজ’ ব্যবস্থার সূচনাকাল হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। যেখানে রাষ্ট্র ও কর্পোরেট পরাশক্তিগুলো এক জোট হয়ে একটি বিশেষ জ্ঞান-অভিজাত শ্রেণি তৈরি করছে এবং সাধারণ মানুষকে সেই প্রক্রিয়াজাত জ্ঞান বা সেবা পেতে চড়া মূল্যে টোল দিতে হচ্ছে। তথ্যের এই অননুমোদিত ব্যবহারের আইনি লড়াইয়ে ইতিপূর্বে অ্যানথ্রোপিককে কপিরাইট লঙ্ঘনের দায়ে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের আর্থিক জরিমানাও গুনতে হয়েছে, যা এই প্রযুক্তির নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই একচেটিয়া আধিপত্যের খেলা শুধু ডিজিটাল দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নেই, এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাস্তব পরিবেশ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রান্তিক মানুষের জীবনে। একটি শক্তিশালী এআই মডেল সার্বক্ষণিক সচল রাখতে বিশাল আকৃতির ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয়, যার জন্য দরকার পড়ে বিপুল পরিমাণ জমি, বিদ্যুৎ এবং কুলিং সিস্টেমের জন্য লাখ লাখ গ্যালন পানি। এই বিপুল পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটিকে অনেক পরিবেশবাদী উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক সম্পদ লুণ্ঠনের আধুনিক সংস্করণ হিসেবে দেখছেন।
উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে ভারত সরকার বৈশ্বিক ক্লাউড পরিষেবা সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করতে ২০ বছরের বিশাল কর ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে, যার মূল লক্ষ্য দেশটিকে বৈশ্বিক এআই পরিকাঠামোর একটি বড় হাব হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু এই উন্নয়ন পরিকল্পনার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে ভারতের স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের। ডেটা সেন্টারের জন্য কৃষি জমি অধিগ্রহণ করায় ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
কেবল এশিয়া অঞ্চলেই নয়, পরিবেশগত ও প্রাকৃতিক সম্পদের এই অতিরিক্ত ব্যবহারের বিরুদ্ধে თავ খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া, আইওয়া বা অ্যারিজোনার মতো এলাকাতেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ও স্থানীয় মানুষের অধিকার হরণ করে যে ডেটা সেন্টারগুলো গড়ে উঠছে, তার চূড়ান্ত অর্থনৈতিক মুনাফা চলে যাচ্ছে বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর পকেটে। অন্যদিকে, স্থানীয় মানুষ হারাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও দীর্ঘদিনের চারণভূমি।
বিশ্লেষকদের মতে, ঔপনিবেশিক আমলের সম্পদ লুণ্ঠনের সাথে আজকের এই নব্য-ডিজিটাল উপনিবেশবাদের পার্থক্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম। অতীতে সম্পদ লুটের পেছনে সামরিক বা রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগ করা হতো, আর বর্তমানে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল অগ্রগতির নামে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো স্বেচ্ছায় এই দীর্ঘমেয়াদী ফাঁদে পা দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অসম বিকাশ যদি অবিলম্বে কোনো আন্তর্জাতিক নীতিমালার আওতায় আনা না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।