অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
আসন্ন অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি সম্প্রসারণ ও দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় বিভিন্ন খাতে ব্যাপক শুল্ক-কর ছাড়ের পাশাপাশি করের আওতা বাড়াতে কিছু কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপের পরিকল্পনা করছে সরকার। একদিকে সাধারণ করদাতা, স্টার্টআপ, স্বাস্থ্য খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব আয় বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খোলা ও খুচরা ব্যবসা পরিচালনায় নতুন কর আরোপের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়নের লক্ষ্য নিয়েছেন, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ এই সম্ভাব্য উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সরকার এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি ও এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনে ব্যবসা-বাণিজ্যে করছাড়ের সিদ্ধান্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, আসন্ন অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৩০ শতাংশ বাড়ানোর কথা শোনা যাচ্ছে। এই বাড়তি রাজস্ব আদায়ের জন্য যেন বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না তৈরি করা হয়, বরং করজাল বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া উচিত।
করের আওতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী বাজেটে অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা। নতুন নিয়মে যেকোনো ব্যক্তি ব্যাংক হিসাব খুলতে গেলে টিআইএন সনদ প্রদর্শন করতে হবে। তবে শিক্ষার্থী, নো ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট (যেমন: ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব), সরকারি ভাতাভোগীদের হিসাব এবং পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম কার্যকর না-ও হতে পারে। বর্তমানে দেশে ১৭ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাব রয়েছে, যা থেকে করজাল সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা দেখছে সরকার।
দেশের প্রায় ৭০ লাখ খুচরা বিক্রেতাকে করের আওতায় আনতে পণ্য সরবরাহের ওপর ০.২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে। এর ফলে পণ্য কেনার সময় প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখবেন পরিবেশক বা সরবরাহকারীরা, যা পরবর্তীতে সরকারি কোষাগারে জমা হবে। এটি ছোট ব্যবসায়ীদের পরিচালনা ব্যয় কিছুটা বাড়িয়ে দিতে পারে।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে চাল, ডাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল ও চিনিসহ ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বিদ্যমান উৎসে কর ১ থেকে ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে জীবন রক্ষাকারী বিভিন্ন সামগ্রীর ভ্যাট ও কর কমানোর বড় সিদ্ধান্ত আসছে।
হার্টের রিং: জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহারের কারণে রিং প্রতি খরচ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
চোখের লেন্স: ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার হতে পারে, যার ফলে লেন্সের দাম কমবে প্রায় ৫ হাজার টাকা।
কিডনি ডায়ালাইসিস: ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর প্রত্যাহারের ফলে রোগীদের সেশন প্রতি খরচ ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।
ওষুধ শিল্প: ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধসহ দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালসের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় নতুন ৯টি পণ্য যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানিতে সার্বিক শুল্ক-কর ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ৫০ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৮০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের ক্ষেত্রে ২ লাখ টাকার অগ্রিম কর কমিয়ে গাড়ির ধারণক্ষমতা অনুযায়ী ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় থাকবে এবং ইভি চার্জার আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক-কর প্রত্যাহার করা হতে পারে।
তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গড়ে তুলতে ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র (গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন) আমদানির ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক তুলে দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণে উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ ও ইনোভেশন ভেঞ্চারগুলোর স্থানীয় পর্যায়ের ১৫ শতাংশ ভ্যাট, সেবা আমদানির ভ্যাট এবং কার্যালয় ভাড়ার ওপর প্রযোজ্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফের সুবিধা অব্যাহত থাকছে। এছাড়া ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করা হচ্ছে এবং সোনা ও স্বর্ণালংকার কেনাবেচায় ৫ শতাংশ ভ্যাট তুলে দিয়ে ভরিপ্রতি ২৫০০ টাকা নির্দিষ্ট করার প্রস্তাব থাকছে।