আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সংঘাত, সহিংসতা ও নির্যাতনের কারণে বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ২০২৫ সালে এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো হ্রাস পেয়েছে। তবে সামগ্রিক সংখ্যা কমলেও গত বছর নতুন করে ৫৪ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে বৈশ্বিক শরণার্থী পরিস্থিতির এই চিত্র উঠে এসেছে।
ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শরণার্থী বা শরণার্থীসদৃশ পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের মোট সংখ্যা ৪ কোটি ১৬ লাখে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী রয়েছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্বজুড়ে নতুন করে বাস্তুচ্যুতির ঘটনা এবং চলমান সংঘাতগুলোর কারণে জনমনে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট নিয়ে এখনো গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।
প্রতিবেদনে একটি ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি নিজ নিজ জন্মভূমি ও আবাসে ফিরে গেছেন। এই প্রত্যাবর্তনের হার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি, যা ১৯৬৫ সালের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রত্যাবর্তনের ঘটনা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। মূলত ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, সুদান, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইউক্রেন ও মিয়ানমারে সবচেয়ে বেশি মানুষ ফিরে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে ইউএনএইচসিআর সতর্ক করে বলেছে, অনেক ক্ষেত্রে এই প্রত্যাবর্তন টেকসই হয়নি। ফিরে যাওয়া মানুষগুলোকে নিজ দেশে এখনো চরম নিরাপত্তাহীনতা, অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং মৌলিক নাগরিক সেবার সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
আঞ্চলিক তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ২৯ লাখ আফগান নাগরিক দেশে ফিরেছেন, যাদের মধ্যে ১৯ লাখই ছিলেন অন্যান্য দেশে আশ্রিত শরণার্থী। অন্যদিকে, সিরিয়ায় দীর্ঘদিনের বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের ফলে সেখানে প্রত্যাবর্তনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গত বছর প্রায় ১৩ লাখ সিরীয় নাগরিক নিজ দেশে ফিরে গেছেন।
তবে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘরে ফেরার পরও দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী সংকট অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে বলে মনে করে জাতিসংঘ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ শরণার্থী টানা পাঁচ বছর বা তার চেয়ে বেশি সময় ধরে নিজ দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ না থাকায় এই বিপুল জনসংখ্যা বছরের পর বছর ধরে আশ্রয় শিবিরগুলোতে অবরুদ্ধ হয়ে আছেন।
ইউএনএইচসিআর-এর হাইকমিশনার বারহাম সালিহ সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বলেন, সাময়িক আশ্রয় ও সুরক্ষা মানুষের জীবন রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে লাখ লাখ শরণার্থী বছরের পর বছর ধরে নিজেদের জীবন পুনর্গঠনের সুনির্দিষ্ট সুযোগ ছাড়া যেভাবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানবিক সংকট দূর করতে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
বিশ্বব্যাপী চলমান এই সংকট নিরসনে ইউএনএইচসিআর আগামী এক দশকের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সংস্থাটি ২০৩৫ সালের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শরণার্থী এবং মানবিক সহায়তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তারা কেবল জরুরি ত্রাণ সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, শরণার্থীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। এর মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং তাদের মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে, যাতে বৈশ্বিক মানবিক সহায়তার ওপর চাপ কমানো সম্ভব হয়।