আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সামরিক সংঘাত এক নজিরবিহীন ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডবাহিনী (আইআরজিসি) জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ও বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে একযোগে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসির দাবি, তারা অঞ্চলের মোট ১৮টি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে এই সমন্বিত হামলা পরিচালনা করেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ও আইআরজিসির পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিকে (মুয়াফফাক আল-সালতি বিমানঘাঁটি) প্রধান লক্ষ্যবস্তু করে ১২টি দূরপাল্লার সলিড-ফুয়েল ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। তেহরানের দাবি, ওই ঘাঁটিতে অবস্থান করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৫, এফ-১৬ এবং অত্যাধুনিক এফ-৩৫ মডেলের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের মূল ভূখণ্ডে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আইআরজিসির অ্যারোস্পেস ফোর্স দাবি করেছে, সুনির্দিষ্ট আঘাতের মাধ্যমে মার্কিন বিমানগুলোর হ্যাঙ্গার, যুদ্ধবিমান এবং একটি কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার ধ্বংস করা হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির এই দাবির বিষয়ে স্বাধীন কোনো আন্তর্জাতিক সূত্র থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
শুধু জর্ডান নয়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সমীকরণকে নাড়িয়ে দিয়ে কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েতের প্রধান মার্কিন ঘাঁটি আলী আল-সালেম এবং আহমেদ আল-জাবের বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে কুয়েতি সামরিক বাহিনীর যৌথ স্টাফ নিশ্চিত করেছে। কুয়েত ও বাহরাইনের আকাশসীমায় রাতভর বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয় এবং নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় স্থানীয় প্রশাসন। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর অত্যন্ত কৌশলগত ‘পঞ্চম নৌবহর’ (ফিফথ ফ্লিট) এবং শেখ ঈসা বিমানঘাঁটিও এই হামলার শিকার হয়েছে। সেখানে একাধিক ড্রোন ও প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা লক্ষ্য করে আঘাত হানা হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।
আইআরজিসি জানিয়েছে, এই নজিরবিহীন হামলা মূলত মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক আগ্রাসনের সরাসরি প্রতিক্রিয়া। এর আগে মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর, রাজধানী তেহরানের পশ্চিমাঞ্চলীয় কারাজ, নজরআবাদ শিল্পাঞ্চল এবং পিশভা কাউন্টিতে অবস্থিত বিপ্লবী গার্ডবাহিনীর একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার জবাবে আত্মরক্ষার্থে এই হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান তাদের অ্যারোস্পেস এবং নৌবাহিনীর সমন্বয়ে পাল্টা আঘাতের এই বড় সিদ্ধান্ত নেয়।
এই সামরিক সংঘাতের জেরে ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে। আইআরজিসির নৌবাহিনী এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরে অবস্থানরত কোনো বাণিজ্যিক জাহাজ বা তেলবাহী ট্যাঙ্কার যেন তাদের নোঙর ছেড়ে না নড়ে এবং যেকোনো অননুমোদিত জাহাজকে লক্ষ্য করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্বের মোট উত্তোলিত খনিজ তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সরাসরি সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক চরম বিপজ্জনক খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। কাতারসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করলেও, উভয় পক্ষের একগুঁয়ে অবস্থানের কারণে তা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। জর্ডান, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো মিত্র দেশগুলোর ভূমি ব্যবহার করে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং তার জবাবে ইরানের পাল্টা হামলা এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশকেও দীর্ঘমেয়াদী আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে টেনে আনতে পারে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।