খেলাধূলা ডেস্ক
দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বৈশ্বিক ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের আসর বিশ্বকাপে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ে। মহাদেশীয় অঞ্চলের অত্যন্ত কঠিন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বাছাইপর্বের বৈতরণী পার হয়ে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে দলটির এই যোগ্যতা অর্জন আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। একপর্যায়ে যাদের বিশ্বমঞ্চে অংশগ্রহণ প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, সাম্প্রতিক সময়ে মাঠের পারফরম্যান্সে অভাবনীয় উন্নতি ঘটিয়ে তারাই এখন আসন্ন বিশ্বকাপের অন্যতম সম্ভাব্য চমক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের (কনমেবল) বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে প্যারাগুয়ের শুরুর যাত্রাটি ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক ও বিপর্যয়কর। প্রাথমিক পর্বের প্রথম ছয়টি ম্যাচে দলটি মাত্র একটি গোল করতে সক্ষম হয় এবং সমসংখ্যক ম্যাচে তাদের পয়েন্ট সংগ্রহ ছিল মাত্র পাঁচ। এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা টুর্নামেন্টে, যেখানে গ্রুপ পর্বের টানা তিনটি ম্যাচেই পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় তারা। এই চরম বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে প্যারাগুয়ে ফুটবল ফেডারেশন তৎকালীন প্রধান কোচ ড্যানিয়েল গারনেরোকে পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
কোচ পরিবর্তনের এই সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তটিই পরবর্তীকালে প্যারাগুয়ে জাতীয় ফুটবল দলের সামগ্রিক ভাগ্য ও খেলার ধরন বদলে দিতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। গারনেরোর বিদায়ের পর দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় অভিজ্ঞ আর্জেন্টাইন কৌশলবিদ গুস্তাভো আলফারোর ওপর। দায়িত্ব গ্রহণের পর আলফারোর যুগোপযোগী ও সুদূরপ্রসারী কৌশলের ওপর ভর করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে প্যারাগুয়ে। বিশেষ করে নিজেদের ঘরের মাঠে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি ব্রাজিল, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং শক্তিশালী উরুগুয়ের মতো দলগুলোকে পরাস্ত করে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে নেয় তারা। এর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের মাঠে বেশ কয়েকটি কৌশলগত ড্র দলটিকে বিশ্বকাপের মূল পর্বে ওঠার দৌড়ে টিকিয়ে রাখতে এবং শেষ পর্যন্ত টিকিট নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
বাছাইপর্বের জটিল সমীকরণ চুকিয়ে এবং প্রতিযোগিতার অন্তত এক ম্যাচ হাতে রেখেই সরাসরি মূল পর্বের টিকিট নিশ্চিত করে প্যারাগুয়ে। দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের পয়েন্ট তালিকায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করে তারা বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেয়। এর আগে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত খেলার গৌরব অর্জন করেছিল, যা ছিল তাদের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা সাফল্য। দীর্ঘ দেড় দশক পর ফিরে এসে পূর্বের সেই সাফল্যের পুনরাবৃত্তি করা বর্তমান প্রেক্ষাপটে কঠিন চ্যালেঞ্জিং হলেও, দলটির বর্তমান ফর্ম বিবেচনা করে ফুটবল বিশ্লেষকরা এবার তাদের নকআউট পর্বে বা শেষ ষোলোতে ওঠার বাস্তব সম্ভাবনা দেখছেন। নিরেট ও শক্তিশালী রক্ষণভাগের দৃঢ়তা, ফুটবলারদের উচ্চ শারীরিক সক্ষমতা এবং মাঠে দ্রুত কৌশলগত পরিবর্তনের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই বর্তমানে প্যারাগুয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপের মূল পর্বে গ্রুপ ‘ডি’-তে স্থান পেয়েছে প্যারাগুয়ে। এই গ্রুপে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে স্বাগতিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের শক্তিশালী দল তুরস্ক এবং ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী দল অস্ট্রেলিয়া। গ্রুপটি সবদিক থেকে যথেষ্ট ভারসাম্যপূর্ণ এবং কঠিন হলেও বাছাইপর্বের কঠিন পরীক্ষা পার হয়ে আসা প্যারাগুয়ে শিবির আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে রয়েছে।
প্যারাগুয়ের এই নাটকীয় উত্থানের নেপথ্য কারিগর হিসেবে সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছেন কোচ গুস্তাভো আলফারো। ক্লাব ফুটবলে আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ও শীর্ষ ক্লাব বোকা জুনিয়র্স, সান লোরেঞ্জো এবং রোজারিও সেন্ট্রালের মতো ক্লাবে সফলভাবে কোচিং করানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে এই কৌশলবিদের। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ইকুয়েডর জাতীয় ফুটবল দলকে মূল পর্বে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার ঝুলিতে। প্যারাগুয়ের দায়িত্বভার গ্রহণের পর আলফারো কেবল দলের রক্ষণভাগকেই নিশ্ছিদ্র করেননি, বরং দলের তরুণ ফুটবলারদের ওপর আস্থা রেখে আক্রমণভাগেও নতুন গতি ও প্রাণের সঞ্চার করেছেন। আসন্ন বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ের প্রাথমিক লক্ষ্য আপাতত গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড বা শেষ ১৬ নিশ্চিত করা। তবে দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে দলটি যেভাবে ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তাতে মূল পর্বেও তারা বড় কোনো অঘটন বা চমক ঘটিয়ে দিলে তা বিশ্ব ফুটবলের জন্য মোটেও বিস্ময়কর হবে না।