নিজস্ব প্রতিবেদক
ট্যানারির রাসায়নিক ও বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবহার করে উৎপাদিত পোলট্রি ও মাছের খাদ্য মানবদেহে ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, আলসার এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। এই ধরনের ভেজাল ও ক্ষতিকর খাদ্য চেইন প্রতিরোধের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপের কথাও তিনি সংসদকে অবহিত করেন।
আজ বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই উদ্বেগজনক তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। সংসদ সদস্য তাঁর প্রশ্নে জানতে চেয়েছিলেন, ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে তৈরি পোলট্রি ও ফিশ ফিড দেশে ক্যানসারসহ অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে কি না। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ সত্য এবং বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদনে এর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে মন্ত্রী চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের ভেতরের প্রযুক্তিগত ও রাসায়নিক দিক তুলে ধরে বলেন, কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে ‘ক্রোমিয়াম’ সহ নানা ধরনের মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর ভারী ধাতু ব্যবহার করা হয়ে থাকে। দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় এবং উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে এই বিষাক্ত বর্জ্য বা চামড়ার ছাঁট অংশ সংগ্রহ করে পোলট্রি ও মাছের বাণিজ্যিক খাদ্য তৈরি করছে। এই বর্জ্য মিশ্রিত খাদ্য খাওয়ানোর ফলে উৎপাদিত মুরগির মাংস, ডিম এবং মাছে উচ্চমাত্রায় বিষাক্ত ‘হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম’ জমা হতে থাকে।
জনস্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য দিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাংস বা ডিমে সঞ্চিত এই হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম সাধারণ রান্নার উচ্চ তাপমাত্রাতেও ধ্বংস বা নষ্ট হয় না। ফলে এই বিষাক্ত উপাদান অপরিবর্তিত অবস্থায় খাদ্যচক্রের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এর চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে মানবদেহে ক্যানসার কোষের সৃষ্টি হওয়া, লিভার সিরোসিস, পাকস্থলীতে মারাত্মক আলসার এবং স্থায়ীভাবে কিডনি অকেজো হওয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এই ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত বহুমুখী ও সমন্বিত পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে মন্ত্রী জানান, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে সরকার ইতিমধ্যে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ঐতিহ্যবাহী ট্যানারি শিল্পকে সাভারের হেমায়েতপুরে নবনির্মিত চামড়া শিল্পনগরীতে সফলভাবে স্থানান্তর করেছে। ২০১৭ সালে মহামান্য হাইকোর্টের কঠোর নির্দেশনার পর হাজারীবাগের ট্যানারিগুলোর গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো সব ধরনের ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ কার্যকর করা হয়।
সাভারের আধুনিক চামড়া শিল্পনগরীর সার্বিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে তিনি বলেন, পরিবেশগত বিপর্যয় ও বর্জ্যের অবৈধ ব্যবহার ঠেকাতে সাভারে একটি কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে চামড়াশিল্পের ক্ষতিকর রাসায়নিক বর্জ্য সার্বক্ষণিক পরিশোধনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে তা কোনোভাবেই উন্মুক্ত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে কিংবা পোলট্রি ও ফিশ ফিড তৈরির উদ্দেশ্যে কোনো অসাধু চক্রের হাতে অবৈধভাবে পৌঁছাতে না পারে।
এ ছাড়া রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় অতীতে গড়ে ওঠা ট্যানারির বর্জ্যভিত্তিক অবৈধ পোলট্রি ও ফিশ ফিড কারখানার বিরুদ্ধে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর নিয়মিত অভিযানের কথা উল্লেখ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে এই বিষাক্ত খাদ্য উৎপাদনকারী অসংখ্য কারখানা সিলগালা ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ট্যানারির রাসায়নিক বর্জ্য থেকে তৈরি পোলট্রি খাদ্যের ক্যানসার ঝুঁকি বৈজ্ঞানিকভাবে একটি প্রমাণিত সত্য বিধায়, এই জাতীয় অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতা নীতি এবং দৃশ্যমান প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।