বিশেষ প্রতিবেদক
বিশ্বশান্তি রক্ষা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অসামান্য অবদান এবং আত্মত্যাগকে স্মরণের মধ্য দিয়ে আজ বুধবার দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস পালিত হচ্ছে। প্রতি বছর ২৯ মে বৈশ্বিকভাবে দিবসটি উদযাপিত হলেও, এ বছর ওই সময়ে বাংলাদেশে পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটি থাকায় জাতীয়ভাবে আজ দিবসটি উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। দিবসটি উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে এবং সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর উদ্যোগে রাজধানীসহ সারাদেশে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদান ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন নাজুক ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘ শান্তি মিশনগুলোতে বাংলাদেশি সদস্যদের এই নিষ্ঠা ও দক্ষতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুবার প্রশংসিত হয়েছে এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালে প্রথম ইরাক-ইরান সামরিক পর্যবেক্ষণ গ্রুপ (ইউনিইমগ) মিশনে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সূচনা ঘটে। এরপর থেকে বিগত সাড়ে তিন দশকে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অসংখ্য সংঘাতপ্রবণ দেশে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আফ্রিকার কঙ্গো, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, দক্ষিণ সুদান, মালি ও লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা মোতায়েন রয়েছেন। তারা কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বা সামরিক নিরাপত্তাই নিশ্চিত করছেন না, বরং স্থানীয় বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা প্রদান, জাতীয় নির্বাচন পরিচালনায় কারিগরি সহযোগিতা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামো পুনর্গঠনেও সরাসরি অবদান রাখছেন।
বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার এই মহৎ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ পর্যন্ত বহু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন। প্রতিকূল পরিবেশ, সংঘাতময় পরিস্থিতি এবং জীবনঝুঁকি উপেক্ষা করে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের এই সর্বোচ্চ ত্যাগের গভীর স্বীকৃতি দিয়েছেন।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উদযাপনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০০৭ সালে দেশে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে এই দিবসটি উদযাপিত হয়েছিল। সেই বছর সফলভাবে দিবসটি আয়োজনের পর জাতিসংঘের বাংলাদেশ আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয় থেকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছিল।
২০০৭ সালের ৩১ মে প্রেরিত এক পত্রে তৎকালীন জাতিসংঘ আবাসিক সমন্বয়কারী রেনাটা লক-দেসালিয়েন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। ওই চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল তৎকালীন সেনা সদর দপ্তরের ওভারসিজ অপারেশনস অধিদপ্তরের পরিচালক এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী দিবস উদযাপন কমিটির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খানকে। পত্রে দেশে প্রথমবারের মতো শান্তিরক্ষী দিবস আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুব হায়দার খানের নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়। জাতিসংঘের এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রতি বিশ্বসংস্থার দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ও সম্মানের একটি অন্যতম ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশের এই ধারাবাহিক অংশগ্রহণ এবং বিশ্বস্ত অংশীদারিত্ব দেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অত্যন্ত শক্তিশালী দিক। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের পেশাদারিত্ব, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নিরপেক্ষতার ধারা বজায় রেখে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশের গৌরবময় অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।