আইন আদালত ডেস্ক
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী রামিসা আক্তারকে (৮) ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায়ের জন্য আগামী ৭ জুন (রবিবার) দিন ধার্য করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকার মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের এই দিন নির্ধারণ করেন। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি গত মে মাসে রাজধানীর পল্লবী এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।
আদালত সূত্রে জানা যায়, মামলার যুক্তিতর্ক শুনানিতে অংশ নিতে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে কঠোর নিরাপত্তায় আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আজিজুর রহমান দুলু আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করেন। অন্যদিকে, আসামিপক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ আসামিদের নির্দোষ দাবি করে খালাস চেয়ে আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন।
এর আগে গত ১ জুন (সোমবার) আদালত এই মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দেন। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে পরদিন ২ জুন চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন আদালত। ৩ জুন (বুধবার) আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তারা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।
মামলার নথির বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৪ মে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগপত্র (চার্জশিট) আমলে নেন। এর আগে একই দিনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন। পরবর্তীতে দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে মামলাটি বিচারের জন্য এই বিশেষ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। মামলার এজাহারে রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৭ জনকে সাক্ষী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য আদালত আমলে নিয়েছেন।
ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা আক্তার স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সে নিজ বাসা থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না খাতুন তাকে কৌশলে তাদের ঘরের ভেতরে ডেকে নেয়। পরবর্তীতে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার স্কুলে যাওয়ার সময় হলে তার মা তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে আসামির বন্ধ ঘরের দরজার সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পেয়ে তাদের সন্দেহ হয়। দীর্ঘ সময় ডাকাডাকির পরও ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা মিলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন রক্তাক্ত মরদেহ এবং ঘরের ভেতর একটি বড় বালতির মধ্য থেকে তার বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়।
এই নৃশংস ঘটনার পর উপস্থিত জনতা জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল করে পুলিশকে অবহিত করে। খবর পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত স্বপ্না খাতুনকে আটক করে নিজেদের হেফাজতে নেয়। ঘটনার পর প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা পালিয়ে গেলেও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার দিনই নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এই ঘটনায় গত ২০ মে নিহত শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে সোহেল রানা ও স্বপ্না খাতুনকে সুনির্দিষ্ট আসামি করে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। রাজধানীতে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে এবং অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবিতে এই মামলার রায়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞরা।