নিজস্ব প্রতিবেদক
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে চলতি বছরের গত আড়াই মাসে হাসপাতালটিতে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৬ জন শিশুর মৃত্যু হলো।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সর্বশেষ মারা যাওয়া শিশুটি একটি আট মাস বয়সী কন্যাসন্তান। তার বাড়ি গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার মাওনা এলাকায়। হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে গত ৩ জুন তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই দিন বিকেল ৪টার দিকে শিশুটি মারা যায়। আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে হাসপাতালের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মমেক হাসপাতালের পরিসংখ্যান ও নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলটিতে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে আরও ২৫ জন শিশু এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালের নির্দিষ্ট আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, চলতি বছরের ১৭ মার্চ থেকে ময়মনসিংহ ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকে হামের লক্ষণ নিয়ে শিশুরা হাসপাতালে আসতে শুরু করে। ১৭ মার্চ থেকে আজ ৪ জুন সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে সর্বমোট ১ হাজার ৮৫২ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। আক্রান্তদের একটি বড় অংশই ময়মনসিংহ ছাড়াও গাজীপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আসছে। চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের অধিকাংশেরই আগে থেকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় হামের টিকা নেওয়া ছিল না অথবা তারা তীব্র পুষ্টিহীনতায় ভুগছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত বছরের এই সময়ে শিশুদের মধ্যে হাম ও জলবসন্তের মতো সংক্রামক রোগের প্রকোপ দেখা যায়। তবে এবার আক্রান্তের সংখ্যা ও জটিলতা অন্যান্য বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি। হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত বায়ুর মাধ্যমে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাহায্যে ছড়ায়। আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে এলে অন্য শিশুরাও দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা এবং পুষ্টিকর খাবার না পেলে শিশুর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিস্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
হাসপাতাল প্রশাসন জানিয়েছে, রোগীর চাপ সামলাতে এবং সংক্রমণ প্রতিরোধে ইতিমধ্যে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের শয্যা সংখ্যা ও জনবল বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সাথে মজুত রাখা হয়েছে প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও তরল স্যালাইন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেবল হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়, বরং মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব এলাকা থেকে বেশি সংখ্যক আক্রান্ত শিশু হাসপাতালে আসছে, সেসব এলাকায় বিশেষ অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। কোনো শিশু যেন নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ না পড়ে, সে লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে শিশুদের শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।