নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একটি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের মধ্যে প্রতি সপ্তাহে পরিচালিত যাত্রীবাহী ফ্লাইটের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি, প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে ডেডিকেটেড কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা এবং তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য পরিবহনের জন্য ‘ফিফথ ফ্রিডম ট্রাফিক রাইটস’ সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রসারিত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য, প্রবাসী শ্রমিক পরিবহন এবং বিমান পরিবহন খাত এক নতুন মাত্রায় উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর কুর্মিটোলায় বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক গণমাধ্যম মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। নতুন গৃহীত সমঝোতার বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি জানান, দুই দেশের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সম্মতিক্রমে এই বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
পূর্বে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মনোনীত এয়ারলাইনসগুলো সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৯টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনা করার সুযোগ পেত। নতুন সমঝোতা স্মারকের অধীনে প্রতি সপ্তাহে এই সংখ্যা বাড়িয়ে ৮৪টিতে উন্নীত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে অতিরিক্ত ৩৫টি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনার প্রত্যক্ষ আইনি ও কারিগরি অনুমোদন তৈরি হলো। বেবিচকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবাসী শ্রমিকদের যাতায়াত এবং হজ ও ওমরাহ পালনকারীদের সংখ্যা বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিয়মিত ফ্লাইটে তীব্র আসন সংকট দেখা দিত। সাপ্তাহিক ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে লাঘব হবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স উপার্জনের অন্যতম প্রধান উৎস সৌদি আরব। বর্তমানে দেশটিতে আনুমানিক ৪০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস ও কর্মরত রয়েছেন। আকাশপথে ফ্লাইট ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধির সরাসরি সুফল পাবেন এই বৃহৎ প্রবাসী জনগোষ্ঠী। খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে বাজার দখলের প্রতিযোগিতাও বাড়বে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বিমান ভাড়ার যে অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, তা নিয়ন্ত্রণে আসার পাশাপাশি প্রবাসীরা তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।
এ ছাড়া নতুন সমঝোতা স্মারকের একটি কৌশলগত দিক হলো বিমান যোগাযোগের বিকেন্দ্রীকরণ। এই চুক্তির ফলে কেবল রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কেন্দ্রিক ফ্লাইট নয়, বরং চট্টগ্রাম ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেও সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা সহজতর হবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সৌদিগামী যাত্রীদের ঢাকামুখী যাতায়াতের কষ্ট কমবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিমানবন্দরের যাত্রী ধারণক্ষমতার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারে বিমান খাতের এই চুক্তিতে বড় ধরনের নতুন সংযোজন ঘটেছে। সমঝোতার আওতায় দুই দেশের মধ্যে সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২১টি ডেডিকেটেড কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দ্রুত পচনশীল পণ্য, বিশেষ করে তাজা শাকসবজি, ফলমূল এবং তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাতের জরুরি শিপমেন্ট সৌদি বাজারে পাঠানো অনেক সহজ ও দ্রুততর হবে।
এই নতুন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হলো ‘ফিফথ ফ্রিডম ট্রাফিক রাইটস’-এর অন্তর্ভুক্তি। এই অধিকারের ফলে বাংলাদেশের মনোনীত এয়ারলাইনসগুলো সৌদি আরবকে ট্রানজিট বা ইন্টারমিডিয়েট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপের নির্ধারিত গন্তব্যে—বিশেষ করে স্পেন ও জার্মানিতে কার্গো পরিবহন করতে পারবে। আকাশপথে বাণিজ্যিক পরিবহনের এই বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক লজিস্টিকস ও কার্গো হাবে রূপান্তরিত করতে সহায়তা করবে বলে মনে করছেন বেবিচকের শীর্ষ কর্মকর্তারা।