নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বন্দরে একটি আধুনিক ‘বে টার্মিনাল’ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে সিঙ্গাপুর সরকার। সফররত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে প্রাথমিক আলোচনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানো, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা এবং বাংলাদেশে বৃহৎ অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই দ্বিপক্ষীয় সফর অনুষ্ঠিত হয়। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সফর পরবর্তী নানা কূটনৈতিক অগ্রগতি ও আলোচনার বিস্তারিত বিষয়বস্তু সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সিঙ্গাপুর সফরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শ্রমবাজারের বিকাশ নিশ্চিত করতে কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে আনুমানিক দেড় থেকে দুই লাখ বাংলাদেশি নাগরিক বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। দেশটিতে অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে বিশেষভাবে আগ্রহী বাংলাদেশ। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সিঙ্গাপুরের শ্রমমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ফলপ্রসূ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আগামী দিনে আবাসন, অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তি ও আধুনিক সেবা খাতে বাংলাদেশি প্রশিক্ষিত জনশক্তি নিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশের বর্তমান বাণিজ্য কাঠামোর সার্বিক পর্যালোচনা এবং বৈষম্য দূর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর কৌশল এবং বাংলাদেশ থেকে নতুন পণ্য ও সেবা রপ্তানির সুযোগ তৈরির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তির কাছ থেকে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের অংশ হিসেবে সফরকালে একটি আধুনিক ‘বর্জ্য থেকে জ্বালানি’ উৎপাদন সংক্রান্ত প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করেন প্রতিমন্ত্রী। প্রকল্পটির অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দেশের পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই কূটনৈতিক সফরের অন্যতম প্রধান দিক হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের ‘বে টার্মিনাল’ নির্মাণে সিঙ্গাপুরের আনুষ্ঠানিক আগ্রহ ও প্রস্তাবকে বিবেচনা করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের মূল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি এবং প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার। দেশের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ ও অতিরিক্ত কনটেইনার পরিবহনের চাপ সামলাতে বে টার্মিনাল প্রকল্পটি অত্যন্ত আধুনিক ও সময়োপযোগী অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য ও আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনায় সিঙ্গাপুরের বিশ্বব্যাপী সুনাম রয়েছে। ফলে এই প্রকল্পে সিঙ্গাপুর সরকারের কারিগরি ও আর্থিক অংশগ্রহণ বাংলাদেশে নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ টানবে এবং গভীর সমুদ্রভিত্তিক বাণিজ্যে দেশের সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করবে।
ব্রিফিংকালে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সম্পর্কের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নির্ভরযোগ্য এবং অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী রাষ্ট্র। দেশের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানি অর্থায়ন ও প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বিশেষ করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিকমানের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ এবং কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পসহ বেশ কয়েকটি বড় মেগা প্রজেক্টে জাপানের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। জাপানি সহায়তায় বাস্তবায়িত এসব মেগা প্রকল্প শেষ হলে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে তা সরাসরি বড় অবদান রাখবে।
সিঙ্গাপুরের এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির মধ্য দিয়ে বৈদেশী মুদ্রার ইতিবাচক প্রবাহ নিশ্চিত হবে। যৌথ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক আলোচনার এ ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের সামগ্রিক সামুদ্রিক অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি ত্বরান্বিত করবে বলে আশা করছেন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।