রাজনীতি ডেস্ক
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের দখলদারিত্ব বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলে দেশের জনগণ তা মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেছেন, বর্তমান কর্তৃপক্ষ ব্যাংকটিকে সাবেক সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের হাতে পুনরায় তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং ব্যাংকের সুরক্ষায় প্রয়োজনে তাদের নেতা-কর্মীরা মাঠে নামতে প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
বুধবার রাতে রাজধানীর মিরপুরের একটি মিলনায়তনে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াত আমির এসব কথা বলেন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সময় ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক সংকট ও জননিরাপত্তা বিষয়ে দলের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
বক্তব্যের শুরুতে জামায়াত আমির বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়ের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, বিগত শাসনামলে সুনির্দিষ্টভাবে ইসলামী ব্যাংক থেকেই অন্তত ৩৪ হাজার কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে তুলে নিয়ে লুটপাট করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের কারণে ব্যাংকটি বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়েছিল। দীর্ঘ সময় পর ব্যাংকটি যখন ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আবারও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি এই প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকার ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটকে অত্যন্ত গভীর উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদে চলতে দেওয়া যায় না। বিগত সরকারের পতনের পর উদ্ভূত রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, একদল দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও দেশের ভেতরে এখনও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী কখনো নিষ্ক্রিয় থাকবে না। সংসদে বা সংসদের বাইরে দলটির ভূমিকা কেমন হবে তা পরিষ্কার করে তিনি বলেন, জামায়াত কখনো ‘গৃহপালিত’ বা আপসকারী বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না, বরং জনগণের প্রকৃত অধিকার আদায়ে একটি শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে যাবে।
জাতীয় সংকট উত্তরণে সরকারি ও বিরোধী পক্ষের যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, দেশের বিদ্যমান সংকটগুলো যদি কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করা হয়ে থাকে, তবে সরকারকে অবিলম্বে তা দূর করতে হবে। আর যদি সংকটগুলো বৈশ্বিক বা প্রাকৃতিক কারণে হয়ে থাকে, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিকল্প ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। জাতীয় সংসদকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা সম্ভব হলে দেশের সিংহভাগ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান আইনি ও গণতান্ত্রিক পন্থায় করা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ভিত্তি জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন দলটির শীর্ষ এই নেতা। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ গ্যাস ক্ষেত্রে মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কিংবা উত্তোলনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। এর ফলে আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে এবং জনগণের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপানো হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গ্যাসের দাম এক লাফে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বৃদ্ধি করে পরবর্তীতে তা মাত্র ৫০ টাকা কমানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা সাধারণ জনগণের পকেট কাটার শামিল এবং এটি এক ধরনের প্রশাসনিক তামাশা।
এর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ক্রমান্বয়ে কঠিন হয়ে পড়ার বিষয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক ধরনের শিথিলতাকে তিনি এর জন্য দায়ী করেন। বর্তমান সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ছাড়া একটি কল্যাণমুখী ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন অসম্ভব উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা দেন যে, জনস্বার্থ রক্ষা, অর্থনৈতিক অরাজকতা বন্ধ এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশব্যাপী নতুন ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের রূপরেখা ও কর্মসূচি ঘোষণা করবে।