খেলাধূলা ডেস্ক
ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের মর্যাদাপূর্ণ আসর উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা জয় করেছে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেইন্ট জার্মেই (পিএসজি)। ফাইনালে ইংলিশ ক্লাব আরসেনালকে পরাজিত করে দলটির এই ঐতিহাসিক বিজয় উদযাপনের সময় ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। সমর্থকদের উন্মত্ততা, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় দেশজুড়ে ৪১৬ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাজধানীসহ বিভিন্ন প্রধান শহরে বিপুল সংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ফাইনাল ম্যাচে টাইব্রেকারে পিএসজির জয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই প্যারিসের বিখ্যাত শঁজেলিজে সড়কে হাজার হাজার সমর্থক ভিড় জমান। প্রাথমিক উদযাপন দ্রুতই সহিংসতায় রূপ নেয়। উত্তেজিত সমর্থকরা বিভিন্ন এলাকায় আতশবাজি ও ফ্লেয়ার জ্বালিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণকৃত চিত্রে দেখা গেছে, প্যারিসের বিভিন্ন সড়কে বৈদ্যুতিক বাইক ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে এবং একাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের শোকেস ভাঙচুর করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটলে জননিরাপত্তা রক্ষার্থে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করতে বাধ্য হয়।
প্যারিস পুলিশ বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে, এই দাঙ্গায় এখন পর্যন্ত ছয়টি যানবাহন, দুটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং একটি বাসস্টপ সম্পূর্ণ বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রবিবার ভোররাত পর্যন্ত চলা এই সহিংসতায় দেশজুড়ে গ্রেফতার হওয়া ৪১৬ জনের মধ্যে কেবল রাজধানী প্যারিস থেকেই ২৮০ জনকে আটক করা হয়েছে। উগ্র সমর্থকদের হামলায় ও পাথরক্ষেপে অন্তত সাতজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। সহিংসতার কারণে প্যারিসের অভ্যন্তরীণ বাস, ট্রেন ও পাতাল রেল পরিষেবায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে, যার ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ নাগরিকেরা।
এই ঘটনার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে দেশটিতে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ এই সহিংসতাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। অন্যদিকে, দেশটির ডানপন্থী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী মেরিন লে পেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একটি ক্রীড়া উৎসবের বিজয় উদযাপন দাঙ্গায় রূপ নেওয়া এবং এর ফলে সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তার ভয়ে ঘরে অবরুদ্ধ থাকতে হওয়া বর্তমান আইনশৃঙ্খলার এক হতাশাজনক চিত্র প্রদর্শন করে।
ক্রীড়া উৎসব ঘিরে ফ্রান্সে এমন প্রাণঘাতী ও উগ্র আচরণ এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০check৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পিএসজির শিরোপা জয়ের রাতেও দেশটিতে ভয়াবহ সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরসহ মোট দুইজন নিহত হয়েছিলেন। অতীতের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই এবার আগে থেকেই পুলিশ সতর্ক অবস্থানে ছিল। দিনের শুরুতে ক্লাবটির নিজস্ব ভেন্যু পার্ক দে প্রিন্সেসে বড় পর্দায় ম্যাচ প্রদর্শনের সময়ও সমর্থকদের একটি অংশের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
উত্তেজনাপূর্ণ ও সহিংস পরিস্থিতির মধ্যেই পিএসজি কর্তৃপক্ষের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিজয়ী খেলোয়াড়দের বরণের প্রস্তুতি চলছে। ক্লাব সূত্রে জানা গেছে, রবিবার চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে প্যারিসের ঐতিহাসিক শঁ দে মার্স এলাকা ও আইফেল টাওয়ারের পাদদেশে একটি বিশেষ বিজয় শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। এই বর্ণাঢ্য র্যালি শেষে ফুটবল দলটির ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকারি বাসভবনে আয়োজিত একটি বিশেষ রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে চলমান থমথমে পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এই উৎসবের পরিধি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করছে স্থানীয় প্রশাসন।