তথ্য প্রযুক্তি ডেস্ক
আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে আদান-প্রদান করা বার্তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘রিচ কমিউনিকেশন সার্ভিসেস’ (আরসিএস) বার্তায় ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’ সুবিধা চালু করেছে প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল ও গুগল। এই নতুন উদ্যোগের ফলে ভিন্ন ভিন্ন অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারকারীদের মধ্যে এখন থেকে ডিজিটাল বার্তা আদান-প্রদান আগের তুলনায় অনেক বেশি সুরক্ষিত হবে। সম্প্রতি এক যৌথ ঘোষণায় প্রতিষ্ঠান দুটি এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে আইফোন এবং অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো শক্তিশালী এনক্রিপশন ব্যবস্থা ছিল না। এর ফলে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের ঝুঁকি ও উদ্বেগ বিদ্যমান ছিল। বিশেষ করে আইফোনের ‘আইমেসেজ’ এবং গুগলের নিজস্ব মেসেজিং অ্যাপের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ব্যবহারকারীরা তৃতীয় পক্ষের অ্যাপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তেন। নতুন এই সমন্বিত আরসিএস প্রযুক্তির ফলে এখন থেকে আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা ডিফল্ট মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করেই সুরক্ষিত যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবেন।
তবে এই নতুন সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট কারিগরি শর্তারোপ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, এই নিরাপত্তা সুবিধার ক্ষেত্রে একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এর বহুমুখী নির্ভরতা। বার্তা প্রেরক ও প্রাপক—উভয় পক্ষের স্মার্টফোন হ্যান্ডসেটের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরকেও এই আরসিএস প্রযুক্তি সমর্থন করতে হবে। বিশেষ করে গ্রুপ চ্যাটের ক্ষেত্রে কোনো একজন সদস্যের ডিভাইস বা অপারেটর যদি এই প্রযুক্তি সমর্থন না করে, তবে ওই গ্রুপের সমস্ত কথোপকথন এনক্রিপশনের আওতামুক্ত থাকবে। অর্থাৎ সম্পূর্ণ চেইনটি সুরক্ষিত রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার ডিভাইসের সক্ষমতা থাকা বাধ্যতামূলক।
অ্যাপলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের অপারেটিং সিস্টেমের সর্বশেষ সংস্করণ ‘আইওএস ২৬.৫’ চালিত আইফোনগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে এই এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপটেড আরসিএস সুবিধা চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে, অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের সর্বশেষ সংস্করণে থাকা ‘গুগল মেসেজেস’ অ্যাপের মাধ্যমে এই সুবিধা পাওয়া যাবে। ফলে যেসব ব্যবহারকারী তাদের ডিভাইসে হালনাগাদ অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছেন, তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই স্তরের নিরাপত্তা সুবিধা উপভোগ করবেন।
এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহারের জন্য ব্যবহারকারীকে আলাদাভাবে কোনো সেটিংস পরিবর্তন বা কনফিগারেশন করতে হবে না। স্মার্টফোন এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক যদি আরসিএস ২.৭ স্ট্যান্ডার্ড বা এর পরবর্তী সংস্করণ সমর্থন করে, তবে এনক্রিপশন প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় হয়ে উঠবে। অ্যাপল ও গুগলের কারিগরি তথ্যানুযায়ী, প্রেরিত কোনো বার্তা সফলভাবে এনক্রিপটেড হলে বার্তার পাশে একটি ছোট ‘লক’ বা তালা চিহ্ন প্রদর্শিত হবে এবং সেখানে ‘এনক্রিপটেড’ লেখা থাকবে। যদি কোনো বার্তায় এই চিহ্নটি না থাকে, তবে বুঝতে হবে সেটি এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশনের আওতাভুক্ত নয়।
এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন মূলত এমন একটি উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তি যেখানে প্রেরকের যন্ত্র থেকে বার্তা পাঠানোর মুহূর্তেই তা জটিল গাণিতিক কোডের মাধ্যমে এনক্রিপ্ট বা রূপান্তর করা হয়। এই কোডটি কেবল কাঙ্ক্ষিত প্রাপকের যন্ত্রেই ডিক্রিপ্ট বা উন্মুক্ত করা সম্ভব। এর ফলে বার্তাটি যখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিবাহিত হয়, তখন মোবাইল অপারেটর, হ্যাকার এমনকি স্বয়ং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাপল বা গুগলের পক্ষেও সেই বার্তার মূল বিষয়বস্তু পড়া বা জানা সম্ভব হয় না। ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে এই প্রযুক্তিকে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্বজুড়ে আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের মধ্যে মেসেজিং নিয়ে যে বৈষম্য বা গ্রিন বাবল-ব্লু বাবল বিতর্ক ছিল, এই উদ্যোগের ফলে সেই বিভাজন প্রযুক্তিগতভাবে অনেকটা কমে আসবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এই সমন্বয়ের ফলে ব্যবহারকারীরা এখন থেকে ছবি, ভিডিও এবং বড় ফাইল শেয়ার করার ক্ষেত্রেও বাড়তি নিরাপত্তা পাবেন। মূলত ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তার অধিকার রক্ষা এবং ক্রমবর্ধমান সাইবার হুমকি মোকাবিলায় বিশ্বখ্যাত এই দুই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সরিয়ে রেখে এই অভিন্ন মানদণ্ড গ্রহণে সম্মত হয়েছে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর ডিজিটাল যোগাযোগ আরও নিরাপদ ও সুসংহত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।