রাজনীতি ডেস্ক
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১-দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত হয়ে অংশ নিলেও আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিজস্ব শক্তিতে লড়াই করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে এরই মধ্যে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নাম চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে দলটি। বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্ব এবং ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জনপ্রিয় মুখগুলোকে সামনে এনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের চমক দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে জামায়াতে ইসলামী। আগে কেবল ‘রুকন’ বা শপথধারী সদস্যদের মনোনয়ন দেওয়ার রেওয়াজ থাকলেও এখন সাধারণ কর্মী-সমর্থক এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদেরও মনোনয়নের আওতায় আনা হচ্ছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রধান শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে জাহির করতে চায় দলটি। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে এরই মধ্যে চারটিতে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে মহানগর আমির ও সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল জব্বারকে মনোনীত করা হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে প্রার্থী করা হচ্ছে হাফিজুর রহমান নামে এক তরুণ শিক্ষককে। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে সাবেক কাউন্সিলর শামসুজ্জামান হেলালী এবং রংপুর সিটি করপোরেশনে এটিএম আজম খানকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও দলটির হাইকমান্ড বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে সেলিম উদ্দিন এবং দক্ষিণ সিটিতে তরুণ নেতা ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) প্রার্থী হতে পারেন বলে জোর আলোচনা চলছে। যদিও জোটের অন্য শরিক দলগুলোর সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণে সমঝোতা নিয়ে কিছু জটিলতা রয়েছে।
জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানান, অতীতে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনের চেয়ে এককভাবে নির্বাচন করে বেশি সফল হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, পৌরসভা, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশনগুলোতে এককভাবেই লড়াই করার নীতিগত সিদ্ধান্ত বহাল আছে। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে জামায়াতের এই একক নির্বাচনের প্রস্তুতির বিপরীতে তাদের জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বিএনপিও পৃথকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এনসিপি এরই মধ্যে বেশ কিছু এলাকায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দলটির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের আগে জোটগত সমঝোতার পথ খোলা থাকলেও প্রস্তুতির স্বার্থে তারা এককভাবে এগোচ্ছে। বর্তমানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে। জামায়াত নেতারা দাবি তুলেছেন, প্রশাসক নিয়োগ অসাংবিধানিক এবং দ্রুত নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে জামায়াত নিজেদের জনসমর্থন যাচাইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে এই সিটি নির্বাচনকে বেছে নিতে চাইছে। একদিকে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা এবং অন্যদিকে একক শক্তিতে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে শেষ মুহূর্তে জোটগত মেরুকরণে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও নাকচ করে দেওয়া যাচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন সূত্র ও নির্বাচন কমিশনের ইঙ্গিত অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। সেই লক্ষ্যেই এখন তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয়ভাবে মাঠ গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজনৈতিক দলগুলো।