নিজস্ব প্রতিবেদক
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সরকারের প্রতিনিধি ও জনগণের সেবক হিসেবে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জেলা প্রশাসকদের সর্বদা মনে রাখতে হবে যে তারা জনগণের সেবক এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত সেবা পৌঁছে দেওয়া।
রবিবার (৪ মে) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। দেশের ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারদের উপস্থিতিতে তিনি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি জাতির ক্রান্তিলগ্নে জাতীয় নেতৃবৃন্দের ঐতিহাসিক অবদান কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, মহান স্বাধীনতার মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন, যা বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা অপরিসীম।
জেলা প্রশাসক সম্মেলনকে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই ধরনের নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলো উঠে আসে। এর ফলে সরকার কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে পারে। তিনি মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা পূরণে প্রশাসনকে আরও বেশি গতিশীল হতে হবে।
মাঠ প্রশাসনের প্রধানদের নির্দেশ দিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, সাধারণ মানুষের অভিযোগগুলো ধৈর্য সহকারে শুনতে হবে এবং সেগুলোর দ্রুত ও কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সরকারি কর্মসূচি ও বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই যেন জনস্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা আনয়ন এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধে জেলা প্রশাসকদের আপসহীন ভূমিকা পালনের নির্দেশ দেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। অসাধু সিন্ডিকেট যেন দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলতে না পারে, সেজন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দেন তিনি। এছাড়া ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমিয়ে আনতে জেলা প্রশাসকদের নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা প্রয়োগের পরামর্শ দেন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, গুজব, অপতথ্য এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত অপরাধ দমনে প্রশাসনকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমাজ থেকে মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বিশেষ করে নারী ও শিশু সুরক্ষা এবং যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়নে জেলা পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি সেবার বিনিময়ে যেন কোনো মানুষ হয়রানির শিকার না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জেলা প্রশাসকদের নৈতিক দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূরমহল আশরাফী এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে বক্তব্য প্রদান করেন। এসময় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিবগণসহ সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে রাষ্ট্রপতি কর্মকর্তাদের সাথে ফটোসেশনে অংশ নেন এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, জেলা প্রশাসকরা তাদের মেধা ও নিষ্ঠাকে কাজে লাগিয়ে দেশের টেকসই উন্নয়ন ও জনকল্যাণে অনন্য ভূমিকা পালন করবেন।