সারাদেশ ডেস্ক
কুষ্টিয়ায় হাম ও হাম সদৃশ উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে রাব্বি নামে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় গত চার মাসে এ নিয়ে হামের উপসর্গে মোট ৯ জন শিশুর মৃত্যু হলো। এদিকে সংক্রমণ পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৪৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শিশু রাব্বির মৃত্যু হয়। হাসপাতালের পরিচালক ডা. এ এইচ এম আনোয়ারুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শিশুটি হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসা প্রদান করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। জেলায় গত কয়েক মাস ধরেই শিশুদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকে কুষ্টিয়ায় হামের সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী। গত চার মাসে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল এবং কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মোট ১ হাজার ২৪ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৮৬৮ জন। বর্তমানে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও জেনারেল হাসপাতালে বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সময়মতো টিকা না নেওয়া এবং সচেতনতার অভাবে শিশুদের মধ্যে এর প্রকোপ বাড়ছে। কুষ্টিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় যে ৪৭ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে, তা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে উচ্চমাত্রার জ্বর, শরীরে লালচে র্যাশ বা দানা, কাশি এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে হাসপাতালে না আসায় ফুসফুসে সংক্রমণ বা নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা তৈরি হচ্ছে, যা মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, অনেক অভিভাবক শিশুদের নিয়মিত টিকাদান সূচি অনুযায়ী হামের টিকা (এমআর টিকা) সময়মতো প্রদান না করায় এই ঝুঁকি বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং আক্রান্তদের দ্রুত হাসপাতালে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্রমেই বাড়তে থাকা রোগীর চাপ সামলাতে তারা বাড়তি প্রস্তুতি নিয়েছেন। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর ভিড় বেশি হওয়ায় বিশেষ কর্নার চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। চিকিৎসকরা অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন যে, কোনো শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। একই সাথে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা এবং প্রচুর তরল খাবার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
জেলার বর্তমান এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক মহল। তাদের মতে, নিয়মিত বিরতিতে এই ধরণের সংক্রামক ব্যাধির প্রকোপ মোকাবিলায় স্থানীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কার্যক্রমের আওতা বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনার দাবি জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যাতে করে সংক্রমণ পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।