আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত একটি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এখন বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। শিশুদের সুরক্ষা ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে অভিযুক্ত মেটা যদি এই মামলায় পরাজিত হয়, তবে প্রতিষ্ঠানটিকে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি তাদের প্ল্যাটফর্মের কার্যপদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মেটা সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যটি থেকে তাদের সেবা পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর ডেমোক্র্যাট অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ এই মামলার প্রধান উদ্যোক্তা। তার অভিযোগ, মেটা পরিকল্পিতভাবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজিয়েছে যা তরুণ ব্যবহারকারীদের আসক্ত করে তোলে। এছাড়া শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি রোধে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মেটা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর প্রচলিত ‘পাবলিক নিউস্যান্স’ বা ‘জনসাধারণের জন্য উপদ্রব’ সংক্রান্ত আইনের আওতায় এই বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই আইনটি সাধারণত এমন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় যেখানে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য বা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অতীতে এই আইনের ওপর ভিত্তি করে তামাক, মাদক এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিষয়ে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এবার একই আইনি কাঠামোর অধীনে মেটাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে রাজ্য সরকার।
উল্লেখ্য, বর্তমানে চলমান শুনানিটি এই মামলার দ্বিতীয় ধাপ। এর আগে গত মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের শুনানিতে জুরি বোর্ড রায় দিয়েছিল যে, মেটা তরুণ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে রাজ্যের ভোক্তা সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করেছে। সেই রায়ের প্রেক্ষিতে আদালত মেটাকে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেয়। বর্তমান ধাপের শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ দাবির পাশাপাশি মেটার কার্যক্রম পরিচালনার ধরনে সুনির্দিষ্ট পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— কঠোরভাবে বয়স যাচাই প্রক্রিয়া চালু করা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ক্ষতিকর কন্টেন্ট প্রতিরোধে অ্যালগরিদম পুনর্গঠন এবং আসক্তি কমাতে অটোপ্লে ও অবিরাম স্ক্রল (ইনফিনিট স্ক্রল) সুবিধা বন্ধ করা।
তবে আদালতের কাছে জমা দেওয়া নথিতে মেটা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, শিশু নিরাপত্তায় তারা ইতোমধ্যেই ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর যেসব পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলোকে প্রযুক্তিগতভাবে ‘অবাস্তব’ এবং ‘অসম্ভব’ বলে আখ্যা দিয়েছে মেটা। তাদের যুক্তি, এ ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে হলে নিউ মেক্সিকো থেকে তাদের ব্যবসা পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না। মেটার দাবি, সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব অভিভাবকদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এবং মানুষের বাকস্বাধীনতা হরণ করে।
এই মামলার ফলাফল শুধুমাত্র নিউ মেক্সিকোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টিরও বেশি অঙ্গরাজ্য এবং ১ হাজার ৩০০টিরও বেশি স্কুল ডিস্ট্রিক্ট মেটা ও সমজাতীয় সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগে মামলা পরিচালনা করছে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নেও মেটা কঠোর আইনি ও নিয়ন্ত্রক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে মেটা ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছে যে, এসব আইনি জটিলতা অদূর ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক মডেল এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বৈশ্বিক এই আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে নিউ মেক্সিকোর আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি পুরো বিশ্বের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবস্থাপনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে।