আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে এই যুদ্ধবিরতি কোনোভাবে লঙ্ঘিত হলে তা বিশ্ববাসীর জন্য ‘অত্যন্ত বিধ্বংসী পরিণতি’ বয়ে আনতে পারে বলে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
গতকাল বুধবার দুই দেশের শীর্ষ নেতার মধ্যে এক দীর্ঘ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় ৯০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আলোচনায় ইরান পরিস্থিতি ছাড়াও ইউক্রেনে চলমান রুশ সামরিক অভিযান ও দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র এবং প্রেসিডেন্ট পুতিনের অন্যতম উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ মস্কোতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ফোনালাপের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইউরি উশাকভ জানান, দুই নেতার মধ্যকার এই কথোপকথন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু কেন্দ্রিক। আলোচনার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি। প্রেসিডেন্ট পুতিন মনে করেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর মাধ্যমে আলোচনার একটি নতুন পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যা সার্বিকভাবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। তিনি ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে সময়োপযোগী এবং সঠিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
তবে এই ইতিবাচক মনোভাবের পাশাপাশি মস্কোর পক্ষ থেকে কড়া সতর্কবার্তা প্রদান করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন উল্লেখ করেন যে, যদি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তার মিত্র ইসরায়েল এই বিরতি ভেঙে পুনরায় ইরানে কোনো ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, তবে তার প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ। তার মতে, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তা কেবল ইরান বা তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর এক বিধ্বংসী প্রভাব ফেলবে।
ভ্লাদিমির পুতিন জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের দীর্ঘদিনের যে রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্য রয়েছে, তা নিরসনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে কূটনৈতিক পন্থাই সর্বোত্তম বিকল্প। তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেন যে, ওয়াশিংটন যদি শান্তিপূর্ণ উপায়ে তেহরানের সাথে চলমান দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে চায়, তবে রাশিয়া সব ধরনের কূটনৈতিক মধ্যস্থতা ও সহায়তা প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ফোনালাপে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও ইউক্রেন সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ইউরি উশাকভ সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পুতিন তাকে মাঠপর্যায়ের সর্বশেষ অবস্থা অবহিত করেন। পুতিন স্পষ্ট করেছেন যে, রুশ বাহিনী বর্তমানে ইউক্রেনে নতুন কোনো অঞ্চল দখলের লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে না। বরং রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো থেকে শত্রু বাহিনীকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা এবং সেসব অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন রুশ সামরিক বাহিনীর প্রধান অগ্রাধিকার।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও পুতিনের এই দীর্ঘ ফোনালাপ বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ইরানের সাথে চলমান অস্থিরতা নিরসনে রাশিয়ার মধ্যস্থতার প্রস্তাব মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আলোচনার মধ্য দিয়ে দুই পরাশক্তির মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের একটি পথ পুনরায় সুগম হলো, যা ভবিষ্যতের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইরানের ওপর ইসরায়েলি অবস্থান এবং ইউক্রেন ইস্যুতে পশ্চিমাদের মনোভাব আগামী দিনগুলোতে ওয়াশিংটন ও মস্কোর সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করবে।