নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও আলোচনায় মিলিত হন বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার। বৈঠকে উভয় পক্ষ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বৈঠকের শুরুতে বাণিজ্যমন্ত্রী বাংলাদেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ এবং সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বিনিয়োগবান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি, ক্রমবর্ধমান বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এখানে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে প্রতি বছর বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যে বিপুল সংখ্যক তরুণ ও দক্ষ জনশক্তি যুক্ত হচ্ছে, তা যেকোনো বৃহৎ শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী ডেনমার্কের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং টেক্সটাইল খাতে আরও বড় পরিসরে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া (ইজ অব ডুইং বিজনেস) আরও সহজ করতে সরকার লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সংস্কার চালিয়ে যাচ্ছে। ডেনমার্কের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আলোচনায় ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার বাংলাদেশের নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানান এবং বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের সম্পর্ক গত কয়েক দশকে নিছক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে একটি শক্তিশালী ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে ডেনমার্ক বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার এবং এই সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত ডেনমার্কের বিশ্ববিখ্যাত লজিস্টিকস কোম্পানি ‘মায়েরস্ক’ (Maersk) সহ অন্যান্য ডেনিশ প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে সফল কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ডেনমার্কের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ শিল্পায়নে বিনিয়োগ করতে বিশেষভাবে আগ্রহী। এছাড়া, রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে ডেইরি ভ্যালু চেইন কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়েও গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, ডেনমার্কের উন্নত ডেইরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদনে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব।
বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কার কার্যক্রম। রাষ্ট্রদূত মোলার জানান, ডেনমার্ক সরকার বাংলাদেশের এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে।
উক্ত বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আব্দুর রহিম খানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। উভয় পক্ষ আলোচনার শেষে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা এবং যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন বা ফোরামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক বাধাগুলো দূর করার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ডেনমার্কের মধ্যে বিশেষ করে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে এক নতুন অধ্যায় সূচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ডেনমার্কের মতো প্রযুক্তিনির্ভর দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের শিল্প খাত আরও আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।