বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুসংহত এবং বহুমুখী সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ঢাকা ও ব্রাসেলস একযোগে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) সকালে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের (ইইএএস) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এরিক কুর্জওয়েল এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।
রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সামগ্রিক কাঠামো, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি স্থান পেয়েছে।
সাক্ষাৎকালে ড. হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় ইইউ অন্যতম প্রধান অংশীদার। বিশেষ করে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান গন্তব্য হিসেবে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকা অপরিসীম। উপদেষ্টা বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্ককে বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় আরও গভীর, কার্যকর এবং টেকসই করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইইউ বাংলাদেশের পাশে থাকবে।
জবাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি এরিক কুর্জওয়েল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বছরগুলোর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। উন্নয়ন সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইইউর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন ও সহায়তা অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন।
বৈঠকে উভয় পক্ষই মনে করে যে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কেবল বাণিজ্যিক সম্পর্ক নয়, বরং প্রযুক্তি হস্তান্তর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সামুদ্রিক অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমির মতো উদীয়মান খাতগুলোতেও সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগকারীদের আরও আকৃষ্ট করার বিষয়েও বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের শ্রম খাতের সংস্কার এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির অগ্রগতি নিয়েও তাদের পর্যবেক্ষণ ও সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বৈঠকে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং মানবিক সহায়তার বিষয়ে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোরালো ভূমিকার কথা পুনব্যক্ত করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ এই কূটনৈতিক বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রদূত মিলার বাংলাদেশে ইইউর চলমান প্রকল্পগুলো এবং আগামী দিনগুলোতে নতুন নতুন খাতে অংশীদারিত্ব সৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে তার মতামত ব্যক্ত করেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এরিক কুর্জওয়েলের এই সফর এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার সঙ্গে তার এই বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে জিএসপি প্লাস সুবিধাসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চলমান এই সংলাপ বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও এই ধরণের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বিশেষ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে। বৈঠক শেষে উভয় পক্ষই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন।