আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান উত্তেজনা এবং যুদ্ধবিরতি আলোচনার স্থবিরতার প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে সংকট নিরসনের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার শঙ্কায় টানা নবম দিনের মতো তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এই দাম বৃদ্ধি লক্ষ করা যায়।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জুন মাসে সরবরাহযোগ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ দশমিক ৯১ ডলার বা ১ দশমিক ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১১৯ দশমিক ৯৪ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ফিউচার্সের দাম ৫৩ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল-প্রতি ১০৭ দশমিক ৫১ ডলারে দাঁড়িয়েছে। টানা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে জ্বালানি তেলের দামের এই ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি বৈশ্বিক অর্থনীতির মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের ওপর মার্কিন কঠোর অবরোধ এবং তেহরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পথগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব রুখতে সামরিক তৎপরতা ও কঠোর কূটনৈতিক অবস্থানের ঘোষণা আসার পর থেকেই বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। দুই পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা প্রশমনে ইতিপূর্বে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বর্তমানে আলোচনা থমকে রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানির মূল বন্দরগুলোতে অবরোধ জোরদার হওয়ার আশঙ্কায় আমদানিকারক দেশগুলো আগাম মজুদ বাড়াতে শুরু করেছে, যা চাহিদাকে সরবরাহ ক্ষমতার বাইরে নিয়ে গেছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী ব্যাঘাত মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। বিশেষ করে ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধের ফলে বিশ্বব্যাপী যে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে, তা প্রশমনে শীর্ষস্থানীয় তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ‘হরমোজ প্রণালী’ দিয়ে তেলের জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও অস্বাভাবিক হারে বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির প্রভাব এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন খরচ এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই ঊর্ধ্বগতি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ওপেকের (OPEC) সদস্য রাষ্ট্রগুলো উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা সেই চেষ্টাকে ম্লান করে দিচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা নিরসন না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের এই অস্থিরতা বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প উৎসগুলো ব্যবহারের কথা ভাবলেও ইরান সংকটের কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান না এলে তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসা সময়সাপেক্ষ বিষয় বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।