বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশের স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান জনবল সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করতে বড় ধরনের কোনো অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই কার্যকর সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। বুধবার (২২ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অংশ নিয়ে তিনি এই প্রস্তাব দেন। তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য, অর্থ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সঠিক সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এবং প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধান থাকলে আগামী দুই মাসের মধ্যেই স্বাস্থ্যখাতের জনবল ও প্রযুক্তিগত সংকট সমাধান করা সম্ভব।
সংসদ অধিবেশনে ডা. ফরিদ দেশের স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০০৭ সালে তার নির্বাচনি এলাকা চৌগাছা উপজেলা হাসপাতালকে ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অথচ দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সেই প্রকল্প এখনো আলোর মুখ দেখেনি। এ ধরনের প্রশাসনিক ধীরগতি প্রান্তিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিকে বিঘ্নিত করছে। তার মতে, অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার মানুষের বিপরীতে অন্তত একজন চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে এই চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র একজন চিকিৎসক নিয়োজিত রয়েছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও যেখানে প্রতি ৯০০ জনে একজন চিকিৎসক রয়েছেন, সেখানে বাংলাদেশের এই ব্যবধান কমিয়ে আনা জরুরি। ডা. ফরিদ কিউবার উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে প্রতি এক হাজারে গড়ে ৮.৫ জন চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি জানান, বিদেশে উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা পর্যালোচনার পর তার উপলব্ধি হয়েছে যে, অর্থ নয় বরং সঠিক ব্যবস্থাপনা ও নজরদারির অভাবেই বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতে জনবলের কার্যকর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে ‘সিস্টেম লস’-কে দায়ী করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি উল্লেখ করেন, অননুমোদিত অনুপস্থিতি, কর্মস্থলে না থেকেও বেতন ভোগ করা, বিনা অনুমতিতে বিদেশে অবস্থান এবং নিয়মবহির্ভূত প্রেষণ বা ডেপুটেশনের কারণে অনেক চিকিৎসক ও কারিগরি কর্মী মূল সেবা কার্যক্রম থেকে দূরে থাকছেন। আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এই অব্যবস্থাপনা চলছে বলে তিনি দাবি করেন। যথাযথ তদারকি এবং আইনি সংস্কারের মাধ্যমে এই ‘সিস্টেম লস’ বন্ধ করা সম্ভব হলে বাড়তি নিয়োগ ছাড়াই অনেক শূন্যস্থান পূরণ করা সম্ভব হবে।
স্বাস্থ্য সংস্কারের পাশাপাশি ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ দেশের অর্থনীতিকে আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল অর্থনীতি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে অর্থ, আইন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এই কমিটি সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সম্ভাবনা যাচাই করে সংসদে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেশ করবে, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিকে স্মার্ট ও সময়োপযোগী করতে সহায়ক হবে।
দীর্ঘ তিন দশক লন্ডনে সফল চিকিৎসা পেশা ছেড়ে দেশে ফেরা এই সংসদ সদস্য বলেন, দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং তৃণমূল মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যেই তিনি প্রবাস জীবন ত্যাগ করেছেন। তার বক্তব্যে তিনি দেশে বিদ্যমান স্বাস্থ্য সংকটের বাস্তবমুখী সমাধানের ওপর জোর দেন। অধিবেশন পরিচালনাকারী ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বক্তব্যের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাকে অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ করেন এবং উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক ও স্টাফদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে জাতীয় বাজেটে বড় কোনো পরিবর্তন ছাড়াই দেশের স্বাস্থ্য সেবার মান অনেকাংশেই উন্নত করা সম্ভব। ডা. ফরিদের এই প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ জনপদে স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়ন এবং সাধারণ মানুষের ভোগান্তি হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।