বাংলাদেশ ডেস্ক
দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই এবং এই খাতের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জাতীয় সংসদে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। গত বুধবার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার উত্থাপিত একটি মূলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জ্বালানি তেলের কারণে দেশের কৃষি উৎপাদন, শিল্পকারখানা বা ব্যবসা-বাণিজ্য কোনোভাবেই ব্যাহত হয়নি। ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
বিরোধী দলীয় নেতা মো. শফিকুর রহমান ‘দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে অবিলম্বে সরকারের কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ’ শীর্ষক আলোচনার সূত্রপাত করেন। এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “বিরোধী দলীয় নেতা দেশব্যাপী যে তীব্র সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন, বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। যদি সত্যিই সংকট থাকত, তবে দেশের বোরো চাষাবাদ ব্যাহত হতো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঠিক নির্দেশনায় গত ১৪ এপ্রিলের পর জ্বালানি তেলের মূল্য সহনীয় মাত্রায় সমন্বয় করায় কৃষিখাতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি।” মন্ত্রী প্রশ্ন তুলে বলেন, দেশের কোনো মিল-ইন্ডাস্ট্রি, স্কুল-কলেজ বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কি জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়েছে? সবকিছু স্বাভাবিকভাবে চলায় একে ‘সংকট’ হিসেবে অভিহিত করা অযৌক্তিক।
জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি রোধে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের বিবরণ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সংস্থাগুলো—র্যাব, পুলিশ ও বিজিবি এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক সজাগ রয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যারা তেল বিক্রির কালোবাজারি চক্র গড়ে তুলেছে, তাদের অনেককেই ইতিমধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। দেশের প্রতিটি জ্বালানি ডিপো ও পাম্পে রুটিন মাফিক তদারকি চালানো হচ্ছে যাতে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে।
সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচার রোধ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, প্রতিবেশী দেশের সাথে মূল্যের পার্থক্য থাকলে সীমান্ত এলাকায় তেল বা সিলিন্ডার পাচারের একটি প্রবণতা থাকে। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও অন্যান্য বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে সরকার সফলভাবে এই পাচার রোধ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ কৃতিত্ব অনেকে স্বীকার করতে না চাইলেও বাস্তব চিত্র হলো বর্তমানে সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি পাচার শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
সংসদ অধিবেশনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের পুরনো পুলিশি কাঠামো রাতারাতি আমূল পরিবর্তন করা কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাসত্ত্বেও বর্তমান সরকার পুলিশ বাহিনীকে মানসিকভাবে শক্তিশালী এবং জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, দেশে আর কোনো ‘মব কালচার’ বা গণপিটুনির সংস্কৃতি চলতে দেওয়া হবে না। অপরাধ নির্মূল করা শতভাগ সম্ভব না হলেও একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে নজির স্থাপন করা হবে।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নয়নের উদাহরণ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চট্টগ্রামের সলিমপুর জঙ্গলের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সলিমপুর জঙ্গল একসময় অপরাধীদের অভয়ারণ্য এবং ‘রাষ্ট্রের ভেতর আরেক রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়েছিল। সরকার অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সেই এলাকাটি দখলমুক্ত করেছে। এছাড়া সুন্দরবন ও সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যু দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান সফলভাবে চলছে।
পরিশেষে, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বিরোধী দলকে নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে সহযোগিতার অনুরোধ করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে এবং জনজীবন স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।