আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার মুখে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ইরান। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল স্পষ্টত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে এবং ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের বহুমুখী সামরিক তৎপরতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে তিনি দাবি করেন।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কূটনৈতিক অবস্থানের প্রেক্ষাপটে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানান, তেহরান গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানে আগ্রহী। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ‘প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, অব্যাহত অবরোধ ও সরাসরি হুমকির’ বিষয়টি আলোচনার টেবিলে বসার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের এই কঠোর অবস্থান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মোড় নিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত ঘোষণার মাধ্যমে। মঙ্গলবার ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলা হলেও বুধবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি কারোলিন লেভিট বিষয়টিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, এই সময়সীমা অনির্দিষ্ট এবং নতুন কোনো সময়সীমা আপাতত নির্ধারিত হয়নি। হোয়াইট হাউস সূত্র মতে, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন নৌ অবরোধের কার্যকারিতায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। লেভিটের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দরকষাকষির মূল নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানে একটি সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভ্যান্স এখনও যুক্তরাষ্ট্রেই অবস্থান করছেন, যার ফলে আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
সমুদ্রসীমায় উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে ইরান গত কয়েকদিনে দুটি কার্গো জাহাজ জব্দ করার দাবি করেছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখা জানিয়েছে, জাহাজগুলো প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া চলাচল করছিল এবং আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার নিয়ম বারবার লঙ্ঘন করেছে। এছাড়া জাহাজগুলো গোপনে প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করার পাশাপাশি নেভিগেশন সিস্টেমে হস্তক্ষেপের মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছে ইরান। এর আগে হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন এলাকায় অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার খবর পাওয়া যায়। মেরিনট্রাফিক ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ভ্যানগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলের কাছে একটি জাহাজ আক্রান্ত হলেও বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এছাড়া গ্রিক মালিকানাধীন একটি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন গ্রিসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ গেরাপেট্রিটিস।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরেও এই অস্থিরতার ছাপ লক্ষ্য করা গেছে। পেন্টাগন জানিয়েছে, নৌবাহিনীর সচিব জন ফেলান আকস্মিকভাবে তার পদ ত্যাগ করেছেন। তার এই তাৎক্ষণিক প্রস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ দর্শানো হয়নি। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন হাং কাও। তবে প্রশাসনিক এই রদবদলের মাঝেও হোয়াইট হাউস স্পষ্ট করেছে যে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের জাহাজ জব্দ করার ঘটনাকে তারা সরাসরি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করছে না। এর প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, জব্দকৃত জাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের মালিকানাধীন নয়।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট খনিজ তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথে সামরিক বা কূটনৈতিক অচলাবস্থা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এবং সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও অবরোধ দীর্ঘায়িত হলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌ-চলাচল ব্যবস্থা মারাত্মক ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।