রাজনীতি ডেস্ক
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে দেশব্যাপী ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে তারা দেশের প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর নেতাকর্মীদের নিজস্ব বলয়ে টানার কৌশল গ্রহণ করেছে। এই প্রক্রিয়ায় বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় ও পরিচিত মুখদের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, বরং জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও অন্যান্য রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী ও সমর্থকদের এনসিপিতে ভেড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত এই দলটি মূলত স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কর্মীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দলটির নীতিনির্ধারকদের মতে, অতীতে যারা চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বা সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, তাদের জন্যই এনসিপির দুয়ার খোলা রাখা হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এ প্রসঙ্গে জানান, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যারা দীর্ঘদিন ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম থেকে এনসিপিতে স্বাগত জানানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিএনপি ও এবি পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতা যোগাযোগ শুরু করেছেন এবং বেশ কিছু যোগদান সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই যোগদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রনেতারা, যারা গত গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তারা দলটিতে যোগ দিতে বিশেষ আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে নতুন ধারার সৃষ্টি হয়েছে, এনসিপি সেই ধারার প্রতিনিধিত্ব করতে চাইছে। ২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই দলটি ইতিমধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। নির্বাচনের এই ফলাফল দলটিকে রাজনীতির মূল ধারায় একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দলটির বর্তমান লক্ষ্য হলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া সকল পক্ষকে একক ছাতার নিচে নিয়ে আসা।
সাম্প্রতিক সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি এবং ইউনাইটেড পিপলস (আপ) বাংলাদেশের প্রায় ৪৫ জন নেতাকর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। যোগ দেওয়া উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশের আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, মুখ্য সমন্বয়কারী রাফে সালমান রিফাত এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ ও দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন। এছাড়া এবি পার্টির ব্যারিস্টার সানি আব্দুল হকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও ছাত্র প্রতিনিধিরা এই তালিকায় রয়েছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বর্তমান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দলের এই বিস্তার প্রসঙ্গে বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করেই নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, দেশে বর্তমানে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির শূন্যতা বিরাজ করছে, যা পূরণে এনসিপি কাজ করে যাচ্ছে। কোন নেতা আগে কোন সংগঠনে ছিলেন, তার চেয়ে বর্তমান আদর্শের প্রতি তাদের আনুগত্যই দলের কাছে মুখ্য বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাংগঠনিক বিস্তারের অংশ হিসেবে এনসিপি প্রধানত বড় দলগুলোর বিদ্রোহী বা বঞ্চিত নেতাদের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে গত নির্বাচনে যারা স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, তাদের সঙ্গে দলের উচ্চপর্যায় থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছে। দলত্যাগী বা বহিষ্কৃত নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদানের প্রস্তাবও দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে, বিএনপির সাবেক নেত্রী রুমিন ফারহানা এবং ঢাকা-৭ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ইসহাক সরকারের মতো পরিচিত মুখদের সঙ্গেও দলটির যোগাযোগ হয়েছে।
এ বিষয়ে ইসহাক সরকার জানান, এনসিপির সঙ্গে তার আলোচনা চলছে এবং তাকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে হামলা-মামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও নিজ দলে অবমূল্যায়িত হওয়ার ক্ষোভ থেকে তিনি নতুন প্ল্যাটফর্মে জনগণের সেবা করার চিন্তা করছেন। তবে রুমিন ফারহানা এনসিপিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টিকে এই মুহূর্তে ভিত্তিহীন ও গুঞ্জন বলে দাবি করেছেন। তিনি স্বীকার করেন যে, অন্যান্য দলের মতো এনসিপিও তাকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, তবে তিনি এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি।
সার্বিকভাবে, জাতীয় নাগরিক পার্টির এই আগ্রাসী সদস্য সংগ্রহ অভিযান বাংলাদেশের চিরাচরিত দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক কাঠামোতে কতটুকু প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানামুখী আলোচনা চলছে। তরুণ নেতৃত্বাধীন এই দলটির ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা এবং অভ্যন্তরীণ সংহতিই নির্ধারণ করবে তারা রাজনীতিতে প্রকৃত গুণগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম কি না। তবে বড় দলগুলো থেকে নেতাকর্মী সংগ্রহের এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।