আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে ইরানের পতাকাবাহী একটি মালবাহী জাহাজ। ‘শুজা-২’ নামের এই জাহাজটি বর্তমানে ভারতের কান্ডলা বন্দরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র ও সামুদ্রিক যান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের বরাতে জানা গেছে, জাহাজটি ইরানের বন্দর আব্বাস সংলগ্ন শহীদ রাজায়ী বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রবেশ করে এটি বর্তমানে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থান করছে। ভূ-রাজনৈতিক সংকটের এই সময়ে এই জাহাজটির চলাচলকে ওয়াশিংটনের তেহরান-বিরোধী অবরোধের বিরুদ্ধে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা জানিয়েছে, তারা ইরানি সংবাদমাধ্যমের এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তবে বৈশ্বিক সমুদ্রযান চলাচল পর্যালোচনাকারী সংস্থা ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, ‘শুজা-২’ প্রকৃতপক্ষে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে এবং এর গতিপথ ভারতের দিকে। জাহাজটির অবস্থান ও গন্তব্য সম্পর্কে মেরিন ট্রাফিকের দেওয়া সংকেত ইরানি দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে হরমুজ প্রণালি একটি উত্তপ্ত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে ইরানের যেকোনো বাণিজ্যিক তৎপরতা বা সামরিক উপস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ভারতের মতো দেশের সঙ্গে ইরানের এই বাণিজ্যিক লেনদেন দক্ষিণ এশিয়ায় তেহরানের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে নির্দেশ করে। ইরান বারবার বলে আসছে যে, তাদের ওপর আরোপিত একতরফা নিষেধাজ্ঞা তারা মানতে বাধ্য নয় এবং নিজেদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অব্যাহত রাখবে। ‘শুজা-২’ জাহাজের এই যাত্রা সেই অবস্থানেরই একটি বহিঃপ্রকাশ।
উল্লেখ্য যে, এর আগেও এই অঞ্চলে বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দ করা বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজ নিয়ে একাধিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা ইস্যুকে পুনরায় আলোচনায় নিয়ে এসেছে। ভারতের কান্ডলা বন্দরে জাহাজটির পৌঁছানোর পর এর মালামাল খালাস এবং পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজটির সফল পথ অতিক্রম করার অর্থ হলো মার্কিন অবরোধের কার্যকারিতা পুনরায় প্রশ্নের মুখে পড়া। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে এই ঘটনাকে ইরানের একটি বড় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তেহরান থেকে নিয়মিত বিরতিতে এই ধরণের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকলে তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করতে পারে।