ঢাকা — জেলা প্রতিনিধি
পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সুসজ্জিত অশ্বারোহী দল। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টায় শুরু হওয়া এ শোভাযাত্রার সামনের অংশে ঘোড়ার পিঠে আরোহী পুলিশ সদস্যদের শৃঙ্খলাবদ্ধ উপস্থিতি দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই শোভাযাত্রা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছরই এই শোভাযাত্রা রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ জনসমাগমে পরিণত হয়। ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
শোভাযাত্রার শুরুতেই ডিএমপির অশ্বারোহী ইউনিটকে সামনের সারিতে দেখা যায়। শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে চলাচল করা ঘোড়সওয়ার পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি পুরো আয়োজনে একটি নিয়ন্ত্রিত ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করে। এ সময় অনেক দর্শনার্থী মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায়, আবার অনেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অশ্বারোহী দলকে পর্যবেক্ষণ করেন।
অশ্বারোহী দলের নেতৃত্বে থাকা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম জানান, এবারের শোভাযাত্রায় ডিএমপির অশ্বারোহী ইউনিটের ২০টি ঘোড়া অংশগ্রহণ করেছে। এগুলো বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এবং বড় জনসমাগমপূর্ণ আয়োজনে দায়িত্ব পালনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ব্যবহৃত ঘোড়াগুলো ‘থ্রোব্রেড রাইডিং হর্স’ প্রজাতির, যেগুলো গতি, সহনশীলতা এবং নিয়ন্ত্রিত আচরণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী অশ্বারোহী ইউনিটের উপস্থিতি শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই নয়, বরং ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বিত এক প্রতীকী উপস্থাপন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ, শোভাযাত্রার গতি বজায় রাখা এবং সার্বিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে এই ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
এবারের শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মোটিফ বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। মোরগ, বেহালা, পায়রা, হাতি ও ঘোড়া—এই পাঁচটি প্রতীকী মোটিফের মাধ্যমে যথাক্রমে শক্তি, সৃজনশীলতা, শান্তি, গৌরব ও গতিময়তার ধারণা তুলে ধরা হয়। এসব মোটিফের মাধ্যমে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সমাজচেতনার বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটানো হয়।
শোভাযাত্রার সাংস্কৃতিক পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হয় ৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায়। ঢোল, বাঁশি ও অন্যান্য লোকজ বাদ্যযন্ত্রের সুরে পুরো ক্যাম্পাস মুখরিত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি প্রায় ২০০ জন শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়, যা নববর্ষ উদযাপনে জাতীয় চেতনার প্রতিফলন ঘটায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ কর্তৃক আয়োজিত মঙ্গল শোভাযাত্রা ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি লাভ করে। সেই থেকে এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষার প্রতীকী আয়োজন হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি পেয়েছে।
এ বছরের শোভাযাত্রায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি এবং সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পুরো আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয় এবং দর্শনার্থীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে।