সারাদেশ ডেস্ক
খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় হঠাৎ করে হাম রোগে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই গায়ে ব্যথা, জ্বর, সর্দি ও লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে শিশু ও অভিভাবকরা হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসার জন্য আসছেন। তবে চিকিৎসকরা জানান, এই মুহূর্তে পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক পর্যায়ে না পৌঁছালেও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ১০ জেলায় অন্তত ৭৯ জন শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত অন্তত ২৬ জন শিশুর শরীরে হাম রোগ নিশ্চিত হয়েছে। কুষ্টিয়ায় সর্বোচ্চ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে; কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতাল মিলিয়ে বর্তমানে ৬৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন, যাদের অধিকাংশই হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি। এছাড়া যশোরে ৬ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন এবং ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও মাগুরায় ২ জন করে শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, অন্যান্য জেলাতেও হাম ছড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই অল্পবয়সি শিশু। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী এবং ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। যেসব শিশু এখনও পূর্ণ টিকাদান পাননি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি তিন শিশুর অবস্থা গুরুতর, তাদের বয়স ৫ থেকে ৮ মাসের মধ্যে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা রুখশানা পারভীন বলেন, “হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা না থাকায় সাপোর্টিভ চিকিৎসার ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে।” তিনি আরও জানান, দ্রুত চিকিৎসা এবং আইসোলেশন ব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি।
হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতি জটিল করছে। আইসোলেশন ইউনিট থাকলেও শয্যা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সীমিত। খুলনা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে চাপ সামলাতে সমস্যা দেখা দিয়েছে। জটিল রোগীদের জন্য এনআইসিইউ সুবিধা সীমিত থাকাও বড় উদ্বেগের বিষয়। খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মুজিবুর রহমান জানান, “সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। বিশেষ করে জেলা হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশ হাসপাতালে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে এনআইসিইউ সংকট এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার রোধে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা রুখশানা পারভীন বলেন, “দ্রুত ভ্যাক্সিনেশনের প্রোগ্রাম শুরু করতে হবে। শিশুদের মধ্যে জ্বর বা ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখা প্রয়োজন।”
উল্লেখ্য, হাম ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও সাপোর্টিভ ব্যবস্থা রোগের জটিলতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং হাসপাতাল প্রশাসন জেলায় প্রাথমিক সতর্কতা ও চিকিৎসা সেবা প্রসারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।