রাজনীতি ডেস্ক
জাতীয় নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ছয় মাসের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকার গঠনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই খাল খনন কর্মসূচি, নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান, কৃষিঋণ মওকুফ এবং ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মানি প্রদানের মতো কয়েকটি কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ মার্চ রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড প্রদান কর্মসূচি’ উদ্বোধন করেন। এ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৭ হাজার নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব নারীপ্রধান পরিবারের কাছে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে কৃষকদের সহায়তায় সরকার ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের আর্থিক চাপ কমানো এবং কৃষি উৎপাদন সচল রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কৃষিঋণ মওকুফের প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সরকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের জন্যও একটি সম্মানি কর্মসূচি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় ব্যক্তিদের সম্মানি প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সামাজিক নিরাপত্তা ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে খাল খনন কর্মসূচি উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। একই দিনে দেশের আরও ৫৪ জেলায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও নতুন উদ্যোগ নেওয়ার বিষয় রয়েছে। খুব শিগগিরই হেলথ কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি সূত্র জানায়, সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকগুলোতে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা তাদের নিজ নিজ খাতের কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে শুরু করেছেন।
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি জানান, জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান, কৃষিঋণ মওকুফ, রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খাল খনন কর্মসূচি, কৃষি কার্ড ও হেলথ কার্ড চালুর বিষয়ও পরিকল্পনায় রয়েছে।
মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে ধাপে ধাপে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের জন্য ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সম্ভাব্য সংকট এড়ানোর বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুত রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দুর্নীতি সম্পর্কে সতর্ক থেকে নির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনে দলটি ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১১টিতে জয়লাভ করে। পরবর্তীতে ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং তার সঙ্গে আরও ৪৯ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করেন। ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সংসদের প্রথম অধিবেশনে মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হন।