আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীতে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনা হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং প্রতি মাসেই বড় ধরনের সেনা ঘাটতির মুখে পড়ছে মস্কো। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইউক্রেনীয় ফ্রন্টে রুশ বাহিনী প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৬ হাজার সেনা হারাচ্ছে, বিপরীতে নতুন সেনা নিয়োগ হচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৩১ হাজার। এর ফলে প্রতি মাসেই গড়ে প্রায় ছয় হাজার সেনার স্থায়ী ঘাটতি থেকে যাচ্ছে রুশ সামরিক বাহিনীতে।
পশ্চিমা নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে চলা এই বিপুল পরিমাণ জনবল ক্ষয় এবং নিয়মিত সেনা ঘাটতির বিষয়টি কেবল সামরিক কাঠামোর ওপরই চাপ তৈরি করছে না, বরং এর ফলে রুশ নীতিনির্ধারক মহলেও অস্থিরতা বাড়ছে। গোয়েন্দা মূল্যায়নে দাবি করা হয়েছে, মাঠপর্যায়ের এই ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় কৌশলগতভাবে বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর প্রবণতা বাড়িয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বিশেষ করে কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে ইউক্রেনের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি ভেঙে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে মস্কো, যাতে শীতের আগে ইউক্রেনীয় জনগণের মনোবল চূর্ণ করা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে বড় পরিসরে সেনা সমাবেশ বা তলব করা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই ক্রেমলিনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক পদক্ষেপ। এর আগে ২০২২ সালের শরতে হওয়া শেষ সেনা সমাবেশের পর দেশ ছেড়েছিলেন প্রায় ১০ লাখ দক্ষ রুশ নাগরিক। যদিও পরবর্তীতে তাঁদের একটি অংশ দেশে ফিরে আসেন, তবে সামগ্রিকভাবে সেই জনবল সংকট পুরোপুরি কাটেনি। পাশাপাশি, ইউক্রেনীয় বাহিনী নিয়মিতভাবে রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও কৌশলগত জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়ে দেশটির অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ বজায় রেখেছে।
এদিকে চলমান এই সংঘাতের মধ্যেই ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা মিত্রদের সামরিক ও কূটনৈতিক সমর্থন আরও জোরদার হয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম বিদেশ সফরে কিয়েভ সফর করেছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে তিনি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় অংশীদারদের পক্ষ থেকে দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কিয়েভের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকেও এই মিত্ররা জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেনকে আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে মস্কো। ব্রিটিশ পদক্ষেপে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা লক্ষ্যবস্তুতে কঠোর প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে রুশ কর্র্তৃপক্ষ। তা সত্ত্বেও পশ্চিমা কর্মকর্তারা মনে করছেন, পুতিন বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ন্যাটোর সঙ্গে কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সংঘাতে জড়ানো এড়িয়ে চলতে চান। মূলত ক্রমিয়া দখল এবং পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সম্প্রসারণ নীতিকে কেন্দ্র করে ২০২২ সালের গোড়ার দিকে ইউক্রেনে যে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক টানাপোড়েন এখনও বৈশ্বিক রাজনীতিতে গভীর সংকট তৈরি করে চলেছে।