অর্থনীতি ডেস্ক
বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাসে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান ম্যাক্রো অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি খাতে ইতিবাচক অগ্রগতি সাধিত হলেও, মূল্যস্ফীতি এবং মাথাপিছু ঋণসহ বাকি ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে তীব্র অবনতি ও গভীর শঙ্কা পরিলক্ষিত হয়েছে। রাজধানীর একটি মিলনায়তনে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত “সরকারের ছয় মাস: পারফরম্যান্স পর্যালোচনা” শীর্ষক মিডিয়া ডায়ালগে এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।
সিপিডির গবেষণায় বলা হয়েছে, নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন সরকারের ১৮০ দিন পূর্ণ হলেও দেশের অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতিতে ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়ে তিন শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং শিল্প খাতে দীর্ঘায়িত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট ও অস্থিতিশীল বাজারের যে বহুমুখী চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান ছিল, বিগত ছয় মাসেও তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমান সরকার বিগত প্রশাসনের কাছ থেকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছে। ব্যাংক খাতের করুণ দশা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার এবং বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মতো নানাবিধ চ্যালেঞ্জ সরকারের সামনে ছিল। তবে এগুলোর প্রতিকার করে অর্থনীতিকে দ্রুত গতিশীল করার ক্ষেত্রে আশানুরূপ কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। সুশাসন ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং সিন্ডিকেট প্রতিরোধের পাশাপাশি মেধার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ নিয়োগের প্রত্যাশা থাকলেও তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি। বিশেষ করে, বিভিন্ন উচ্চপদে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পদায়ন এবং মব ভায়োলেন্স বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা রোধে দৃশ্যমান ও কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অভাব রয়েছে।
তবে সামগ্রিক হতাশার মাঝেও সরকারের কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। এর মধ্যে সংসদ সদস্যদের গাড়ি ও প্লট সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যা মামলার দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন এবং জাতীয় বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধির মতো উদ্যোগগুলোকে স্বস্তিদায়ক বলে উল্লেখ করা হয়।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দেশের চলমান অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে কেবল বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। অর্থনীতিকে দ্রুত সচল এবং টেকসই করতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার কর্মসূচির বাস্তবায়ন অপরিহার্য, যা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে।