আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার সঙ্গে জার্মানির সংযোগকারী কৌশলগত নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় ইউক্রেনের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। কিয়েভে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, এই পাইপলাইন ধ্বংস করার কোনো কার্যক্রমে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ বা সরকারিভাবে কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি এবং ইউক্রেন এই বিস্ফোরণে কখনোই অংশ নেয়নি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক তদন্ত প্রক্রিয়ায় দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রাশিয়া থেকে বাল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে জার্মানিগামী নর্ড স্ট্রিম ১ ও নর্ড স্ট্রিম ২ প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনে আকস্মিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এই অন্তর্ঘাতমূলক বিস্ফোরণের ফলে পাইপলাইনগুলোর বিশাল অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চরম সংকট তৈরি করেছিল। ওই সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে একটি পরিকল্পিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই নাশকতার নেপথ্যে কার হাত রয়েছে, তা উদ্ঘাটনে গত কয়েক বছর ধরে জার্মানি, ডেনমার্ক ও সুইডেনসহ একাধিক দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত চালিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে তদন্তের অগ্রগতির অংশ হিসেবে ইউক্রেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হয়েছে এবং তাদের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলছে। তবে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সাম্প্রতিক এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইউক্রেন সরকার সরাসরি এই রাষ্ট্রীয় নাশকতার অভিযোগ থেকে নিজেদের দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন বিস্ফোরণ কেবল একটি অবকাঠামোগত ক্ষতি ছিল না, বরং এটি ছিল ইউরোপ ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক এবং ভূরাজনৈতিক সম্পর্কের একটি যুগান্তকারী মোড়। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলো যখন রুশ জ্বালানি নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছিল, ঠিক সেই সময়ে এই বিস্ফোরণ পুরো অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। পাইপলাইনটি সচল থাকলে তা থেকে রাশিয়া আর্থিকভাবে লাভবান হতো এবং ইউরোপের একটি বড় অংশ গ্যাস পেত, যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারত।
ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের এই বিবৃতির পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিবিদরা। একদিকে জার্মানির বিচার বিভাগীয় তদন্তে ইউক্রেনীয় নাগরিকদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার বিষয়টির সুরাহা প্রয়োজন, অন্যদিকে ইউক্রেন সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস কূটনৈতিক চাপ কিছুটা হলেও কমাতে পারে। তবে এই বিস্ফোরণের পেছনের আসল কারিগর ও নির্দেশদাতাদের সম্পূর্ণ পরিচয় উন্মোচিত না হওয়া পর্যন্ত ইউরোপের ভূরাজনীতিতে এর কূটনৈতিক ও আইনি প্রভাব অব্যাহত থাকবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।