আইন আদালত ডেস্ক
ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামির ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। এছাড়া চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর ১০ আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও আপিল শুনানি শেষে বহুল আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করল উচ্চ আদালত। এর আগে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ জন আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিলেন। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছিল। নিম্ন আদালতের সেই রায়ের পর নিয়ম অনুযায়ী আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের (ডেথ রেফারেন্স) জন্য মামলার যাবতীয় নথিপত্র হাইকোর্টে আসে। পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেন। সেসব আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্ট সোমবার এই চূড়ান্ত রায় দিলেন।
মামলার নথিপত্র ও ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট থেকে জানা যায়, নিহত নুসরাত জাহান রাফি ছিলেন ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী। ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ওই মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা তাকে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এই ঘটনার পর নুসরাতের মা শিরীন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার অনুসারীরা নুসরাত ও তার পরিবারের ওপর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। কিন্তু নুসরাত ও তার পরিবার আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এরই জেরে ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা চলাকালীন একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ওই দিন সকালে পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েকজন তাকে ছাদে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে মামলা তুলে নিতে পুনরায় চাপ দেওয়া হয় এবং একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বলা হয়। নুসরাত তাতে অস্বীকৃতি জানালে আসামিরা তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। তার শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকদের প্রাণান্তকর চেষ্টার পরও ২০১৯ সালের ১০ এপ্রিল রাতে ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পর সারা দেশে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।
অগ্নিসংযোগের ওই ঘটনার পরপরই ৮ এপ্রিল নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছিলেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর ওই মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। পিবিআই অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত শেষ করে ওই বছরের ২৯ মে ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে। এরপর মাত্র ৬১ কার্যদিবসে বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে নিম্ন আদালত ওই বছরের অক্টোবরে রায় ঘোষণা করেছিলেন।
হাইকোর্টের রায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা পরিবর্তিত হয়েছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আসামিদের অপরাধের মাত্রা নির্ধারণ করেছেন। মূল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশদাতা হিসেবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুজনের সর্বোচ্চ সাজা বহাল রাখা হয়েছে। তবে অপরাধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার মাত্রা বিবেচনায় চারজনকে যাবজ্জীবন এবং বাকি ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়েছে।
আইনজ্ঞদের মতে, হাইকোর্টের এই রায়ের মাধ্যমে আলোচিত এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক ধাপ সম্পন্ন হলো। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বা বাদীপক্ষ এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যাওয়ার আইনি সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে ১০ জন আসামির খালাস পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বাদীপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করবেন কি না, তা নিয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হতে পারে। দেশের বিচার ব্যবস্থায় নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলায় আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় এই রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।