আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে রাশিয়ার কোনো রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব পালন করছেন না। দীর্ঘ সাত বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর গত ২১ জুলাই পদত্যাগ করেন রুশ রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেই কেলিন। তবে তার এই পদত্যাগ এবং উত্তরসূরি নিয়োগে বিলম্বকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের মাত্রা কমানোর যে গুঞ্জন উঠেছে, তা দৃঢ়ভাবে নাকচ করেছে মস্কো। লন্ডনে অবস্থিত রুশ দূতাবাস জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিকে কূটনৈতিক সম্পর্ক অবনমনের ইচ্ছাকৃত প্রয়াস হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই।
রুশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বর্তমান নজিরবিহীন অবনতির জন্য মূলত ব্রিটিশ সরকারের নীতি ও অবস্থানই দায়ী। ইউক্রেন সংকটকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ প্রশাসন বরাবরই রাশিয়া বিরোধী কড়া অবস্থান বজায় রেখে আসছে, যা দুই দেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক মৈত্রী ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকেই কিয়েভের অন্যতম প্রধান ও সরব আন্তর্জাতিক সমর্থক হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে যুক্তরাজ্য। এ পর্যন্ত দেশটি ইউক্রেনকে সামরিক ও অন্যান্য সহায়তা বাবদ প্রায় ২৫ বিলিয়ন পাউন্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যার মধ্যে কেবল সামরিক খাতেই বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ১৬ বিলিয়ন পাউন্ড।
এরই মধ্যে ব্রিটেনকে নতুন করে তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছে মস্কো। রুশ দূতাবাসের অভিযোগ, ইউক্রেনকে সরবরাহ করা যুক্তরাজ্যে তৈরি অত্যাধুনিক ড্রোন রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে পরিচালিত হামলায় সরাসরি ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব হামলায় ব্রিটেন কেবল সহায়তা দিয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং কিয়েভের সঙ্গে সরাসরি ‘সহযোগী ও সহঅপরাধী’ হিসেবে ভূমিকা পালন করছে বলে দাবি করা হয়েছে। মস্কোর মতে, লন্ডন ইচ্ছাকৃতভাবে এই সংঘাতকে আরও প্রলম্বিত ও বিপজ্জনক করার পথ বেছে নিয়েছে এবং এর জন্য তাদের যথাযথ ‘মূল্য দিতে হবে’।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর রুশ রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিতির বিষয়টিকে সম্পূর্ণভাবে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছে। ব্রিটিশ প্রশাসনের স্পষ্ট বক্তব্য, মস্কোয় এখনো যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত ও নিয়মিত কূটনৈতিক মিশন বহাল রয়েছে। সেখান থেকেই রুশ সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন গুরুতর উদ্বেগের বিষয় নিয়মিতভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি, ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি নিজেদের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে লন্ডন জানিয়েছে, রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করার পূর্ণ অধিকার ইউক্রেনের রয়েছে এবং যুক্তরাজ্য ভবিষ্যতেও কিয়েভের পাশে অটল থাকবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার অভ্যন্তরে দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর জবাবে রাজধানী কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে বিমান ও ড্রোন হামলার মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে রুশ বাহিনীও। দুই দেশের এই দীর্ঘস্থায়ী ও বহুমুখী সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে অস্থিরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক চ্যানেলগুলোও চরম স্থবিরতার মুখে পড়েছে। নতুন রুশ রাষ্ট্রদূত নিয়োগের বিষয়ে মস্কো বা লন্ডন—কোনো পক্ষ থেকেই সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা বা কূটনৈতিক রূপরেখা এখনো ঘোষণা করা হয়নি, যা দুই দেশের মধ্যকার চলমান শীতল ও বৈরী সম্পর্ককে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।